৪২ কোটি টাকায় বিক্রি হলো প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের রাইস মিল

বগুড়া প্রতিনিধি: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপির সম্পদ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর তাঁর নির্বাচনী হলফনামা ও পারিবারিক ব্যবসা সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তিনি পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আগে পরিবারের মালিকানাধীন রোমা অটো রাইস মিল ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, মীর শাহে আলমের নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ জমি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রোমা অটো রাইস মিল, রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড, রূপসী ফ্লাওয়ার মিল, মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন, মীর লাবনী-সুনাত ফিলিং স্টেশন, মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি, উত্তর বাংলা ওভারসিজ লিমিটেড, রূপসী কৃষি খামার, রূপসী মৎস্য খামার, রূপসী কংক্রিট ব্রিকস ফ্যাক্টরি, রূপসী মিনি কোল্ড স্টোরেজ এবং রূপসী প্রাণী খামার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মীর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। স্থানীয়দের মতে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে পরিচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর স্বার্থের সংঘাত এড়াতে মীর শাহে আলম পারিবারিক ব্যবসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, পরিচালনা ও সার্বিক দায়িত্ব পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবারের সদস্যরাই পরিচালনা করছেন।
এদিকে ব্যবসার পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি পরিবারের মালিকানাধীন রোমা অটো রাইস মিলটি ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের দাবি, নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বিক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মিলটির ক্রেতা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার গণেশপুর গ্রামের ব্যবসায়ী রবিউল আলম। তিনি বলেন, “আমি ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৪২ কোটি টাকায় রোমা অটো রাইস মিল ক্রয় করেছি এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি।”
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিমন্ত্রীর সম্পদসংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, প্রতিবেদনে হলফনামার তথ্য আংশিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হলফনামায় ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ জমি ও ১২টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য থাকলেও প্রতিবেদনে মাত্র ৩১ শতাংশ জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যা সম্পদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না।
এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রীর নামে নতুন করে ২৪২ শতাংশ জমি ক্রয়ের যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, আলোচিত জমিটি ব্যক্তিগতভাবে মীর শাহে আলমের নামে নয়; বরং রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেডের নামে ক্রয় করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা নেই বলেও তারা দাবি করেন।
প্রতিষ্ঠানগুলোর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর ব্যক্তিগত নামে কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা জমি ক্রয়ের প্রশ্নই আসে না। এ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার অনুরোধ জানাই।”
শিবগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, “মীর শাহে আলম দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ব্যবসার মালিকানা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে আমরা জানি। একটি মহল রাজনৈতিকভাবে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে আমাদের মনে হয়েছে।”
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রউফ রুবেল বলেন, “প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে, শিরোনাম ও প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে যথেষ্ট সামঞ্জস্য ছিল না। পূর্ণাঙ্গ তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন না করেই চটকদার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে সচেতন মহলের অভিমত, হলফনামার পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই না করে আংশিক তথ্য প্রকাশ করলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই এবং সব পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপন করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ।



