দেশবাংলা

হারিয়ে যাওয়ার ৫৫ বছর পর বাড়ি ফিরলেন মোস্তফা

ঠিক যেন সিনেমার গল্প-কাহিনী। ১৯৬৫ সালে ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহের গফরগাঁও রেলস্টেশন থেকে হারিয়ে যান, গোলাম মোস্তফা। স্বজনরা ধরেই নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই।

সবাইকে অবাক কোরে দিয়ে, দীর্ঘ ৫৫ বছর পর তথ্য-প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, স্ত্রী, সন্তান ও নাতি নিয়ে, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের দগদগা গ্রামের, নিজ বাড়িতে ফিরলেন, গোলাম মোস্তফা। স্ত্রী-সন্তানসহ ফিরে আসায় পৈত্রিক ভিটায় বইছে আনন্দের বন্যা।

দীর্ঘদিন পর নিজ ভিটায় এসে স্বজনদের কাছে পেয়ে, আবেগে আপ্লুত বৃদ্ধ গোলাম মোস্তফা, প্রতিবেশী, শৈশবের বন্ধু ও স্বজনরা।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার দগদগা গ্রামের আজিম উদ্দিনের ছেলে গোলাম মোস্তুফা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পার্শ্ববর্তী গফরগাঁও রেল স্টেশনে হারিয়ে যান তিনি। এরপর পাবনার ঈশ্বরদীতে সিরাজ উদ্দিন নামে এক রিকসা গ্যারেজ মালিক, তাকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে লালন পালন করেন। একসময় আশ্রয়দাতার গ্যারেজে কাজ শুরু করেন, গোলাম মোস্তুফা। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে একই এলাকার সোহাগী বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়।

পরিবার নিয়ে ঈশ্বরদীর রহমান কলোনীতে বসবাস করতেন তিনি। গত চার বছর আগে স্ট্রোক করে, প্যারালাইজড হয়ে যান। হঠাৎ ৩ মাস আগে স্ত্রীকে তার হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেন এবং আবছা মনে থাকা বাড়ির ঠিকানা বলেন। পরে ছেলে সজিব হোসেন গুগলে সার্চ দিয়ে, বাবার জন্মস্থান দগদগা গ্রামের সন্ধান পান। গুগল থেকে দগদগা গ্রামের এক ব্যবসায়ীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তার সাথে কথা বলে বাবার ছবি পাঠান।

ওই ব্যবসায়ী বিষয়টি স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞাসা করলে হারিয়ে যাওয়া গোলাম মোস্তুফার ছবি দেখালে তার ছোট ভাই তাকে সনাক্ত করেন। পরে সহোদর ছোট ভাই আবদুল আওয়াল হারিয়ে যাওয়া বড় ভাইয়ের বাসায় গিয়ে তাকে চিনতে পেরে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার জাংগালিয়া ইউনিয়নের দগদগা গ্রামের আজিম উদ্দিনের ছেলে গোলাম মোস্তুফা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পার্শ্ববর্তী গফরগাঁও রেল স্টেশনে ট্রেনে উঠার পর হারিয়ে যান। তারপর পাবনা জেলার ঈশ্বরদী রেল স্টেশনের পার্শ্ববর্তী একটি চায়ের দোকানের সামনে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সিরাজ উদ্দিন নামের এক রিকসা গ্যারেজ মালিক তাকে বাড়িতে আশ্রয় দেন।

তাকে চিকিৎসা করিয়ে লালন পালন করেন। এক সময় গোলাম মোস্তুফা আশ্রয়দাতার রিকসা গ্যারেজের কাজে সাহায্য করতে শুরু করেন। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে ওই এলাকার সোহাগী বেগমকে বিয়ের করেন তিনি। বিবাহের পর তাদের দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। বড় ছেলে সজিব হোসেন একটি কোম্পানীতে চাকুরী করেন। ছোট ছেলে সাইফুল ইসলাম সুরুজ ব্যবসা করেন। মেয়ে সুমনা ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করেন।

এমনি অবস্থায় তার পরিবার নিয়ে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রহমান কলোনীতে বসবাস করে আসছিলেন। গত চার বছর আগে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে প্যারালাইজড হয়ে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয়। হঠাৎ তিন মাস আগে স্ত্রী সোহাগীকে ডেকে তার হারিয়ে যাওয়ার কথাগুলো বলেন। সেই সময় তার বাড়ির ঠিকানা মেয়েকে কাগজে লিখতে বলেন।

পরে ছেলে সজিব হোসেন গুগল ম্যাপে সার্চ দিয়ে তার পিতার জন্মস্থান দগদগা গ্রামের সন্ধান পান। গুগল থেকে দগদগা গ্রামের এক ব্যবসায়ীর মোবাইল নম্বার সংগ্রহ করে তার সাথে কথা বলে পিতার ছবি ফেসবুকে পাঠান। ওই ব্যবসায়ী বিষয়টি ওই এলাকার লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করলে ও হারিয়ে যাওয়া গোলাম মোস্তুফার ছবি দেখালে তার ছোট ভাই আবদুল আওয়াল তাকে সনাক্ত করেন।

পরে গত ২ অক্টোবর সহোদর ছোট ভাই আবদুল আওয়াল হারিয়ে যাওয়ার বড় ভাইয়ের বাসায় গিয়ে তাকে চিনতে পেরে নিজ বাড়িতে ফিরে আসার জন্য বলেন। শুক্রবার দুপুরে গোলাম মোস্তফা স্ত্রী-সন্তানসহ ৫৫ বছর পর নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।

দগদগা গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি জালাল উদ্দিন বলেন, শৈশবে গোলাম মোস্তুফাকে নিয়ে আমরা এক সাথে মাঠে খেলাধুলা করেছি। তার হারিয়ে যাওয়ার খবরে অনেক কষ্ট পেলেও এতদিন পর ফিরে এসেছে খবর পেয়ে তাকে দেখতে ছুটে এসেছি।

ভাতিজা লোকমান হাকীম বলেন, চাচা হারিয়ে যাওয়ার পর অনেক খোঁজাখুজি করে তাকে পাইনি। দীর্ঘ ৫৫ বছর পর চাচাকে ফিরে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত।

এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেনু বলেন, হারিয়ে যাওয়া গোলাম মোস্তুফা ৫৫ বছর পর নিজ বাড়িতে ফিরে আসার খবরটি আমি শুনেছি। দীর্ঘদিন পর এলাকার ছেলে এলাকায় ফিরে আসায় দগদগা গ্রামের মানুষ খুবই আনন্দিত হয়েছে।

খসরু মিয়া, বাজিতপুর প্রতিনিধি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button