মধ্যপ্রাচ্যআন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্র

ইরানের হামলার পর কী করবে সৌদি, কাতার, দুবাই?

যুক্তরাষ্ট্রইসরাইল-এর বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন আরব দেশের দিকে। এসব হামলায় শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটিই নয়, জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বহুদিনের গড়ে ওঠা নিরাপদ ভ্রমণ, পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূলভিত্তি—তেল ও গ্যাস খাত—নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

আরব দেশগুলোর দ্বিধা

উপসাগরীয় সরকারগুলো শুরু থেকেই এই সংঘাত এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের ভূখণ্ডে হামলা হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে—তারা কি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে?

কাতার-এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, সার্বভৌমত্ব ও অবকাঠামোর ওপর আঘাত অগ্রহণযোগ্য। সম্ভাব্য জবাবের ক্ষেত্রে “সব বিকল্প খোলা” রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তবে একইসঙ্গে কাতার স্পষ্ট করেছে, এমন হামলা বিনা জবাবে থাকবে না।

প্রতিরক্ষা বনাম অস্থিতিশীলতা

ইরানের নিক্ষিপ্ত বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত করা হলেও ধ্বংসাবশেষ থেকে অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। ড্রোন হামলাগুলো তুলনামূলক কম ক্ষতিকর হলেও বিমান চলাচল ও বাণিজ্য কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইরানের কৌশল হতে পারে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোকে চাপের মুখে ফেলে তাদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর যুদ্ধবিরতির চাপ সৃষ্টি করা।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান ইসরাইলের দিকে যত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে, প্রায় সমসংখ্যক নিক্ষেপ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত-এর দিকেও—যা অঞ্চলটির প্রধান বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি।

তেল-গ্যাস: বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি

উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস শিল্প বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম স্তম্ভ। এ খাতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে জ্বালানি অবকাঠামো এই সংঘাতে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

উল্টো ফলের সম্ভাবনা

তবে তেহরানের এই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে পারে। এখন পর্যন্ত তারা নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দেয়নি। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অবস্থান বদলাতে পারে।

এই মুহূর্তে আরব দেশগুলো মূলত আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে। তবে যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হয়, সেটিই তাদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস-এর হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং লেবানন ও সিরিয়ায় উত্তেজনার কারণে আরব বিশ্বে ক্ষোভ বাড়ে। বিশেষ করে কাতারে হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগে উত্তেজনা তীব্র হয়।

তবুও ইরানের সাম্প্রতিক হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঐক্য তৈরি করছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-এর সদস্য ছয় দেশ—সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান—জরুরি বৈঠকে সংহতি প্রকাশ করেছে।

দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষায় “প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা” নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ইরানকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনার যুদ্ধ আপনার প্রতিবেশীর সঙ্গে নয়।”

সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় অঞ্চল এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে প্রতিরক্ষা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতি একসঙ্গে সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button