ছেলেকে বিড়ালের আঁচড়, টিকার জন্য টাকা হাতে রোগী খুঁজছেন মা

বাংলা টিভি ডেস্ক: হাসপাতালের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে ১০ বছরের মাহির আহানাফকে নিয়ে বিষণ্ণ মনে বসে আছেন মা হোসনে আরা। বিড়ালের আঁচড়ের ক্ষত নিয়ে শিশু মাহিরও নিশ্চুপ। কিন্তু মায়ের চিন্তা অন্য জায়গায়। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তিনি আক্রান্ত সন্তানকে টিকা দিতে হাসপাতালে বসে আছেন অন্য রোগীর অপেক্ষায়। নতুন কোনো রেবিস ভ্যাকসিনের রোগী পেলেই তার ছেলেকেও দিতে পারবেন জলাতঙ্কের টিকা। কারণ হাসপাতালের কাউন্টারের কাচে সাঁটানো সাদা কাগজে লেখা ‘সরকারি ভ্যাকসিন সাপ্লাই বন্ধ’।
হোসনে আরার মতো অসংখ্য মানুষের জন্য এই হাসপাতালটিই ছিল একমাত্র ভরসা। গত সাড়ে চার মাস ধরে সেখানে নেই সরকারি ভ্যাকসিন। পকেটে টাকা না থাকলে মিলছে না প্রতিষেধক। কখনো টাকা থাকলেও সহজে মিলছে না ভ্যাকসিন কেনার চার সঙ্গী। জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের এমন সংকট দেখা দিয়েছে জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে।
জীবন রক্ষাকারী এই প্রতিষেধক সরকারিভাবে সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন জেলা ও আশপাশের অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ মানুষ। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালটিতে এই সংকট শুরু হলেও সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের টাকা দিয়ে এসব ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো দিন ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী আসেন। এতে গড়ে প্রতিদিন ১৫০ জন রোগীকে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর থেকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ‘ভিসি’ এবং রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) ভ্যাকসিনের মজুত পুরোপুরি শূন্য হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সরকারিভাবে কোনো ভ্যাকসিন হাসপাতালে পৌঁছায়নি। এজন্য কুকুর, বিড়াল কিংবা শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে আসা রোগীরা সরকারিভাবে বিনামূল্যে পাওয়া এই ভ্যাকসিনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বর্তমানে একটি ‘ভিসি’ ভ্যাকসিনের দাম প্রায় ৫২০ টাকা। এক প্যাকেটে চার শিসি থাকায় এটি চারজন রোগীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। সে হিসেবে প্রতিজনের প্রতি ডোজে খরচ পড়ছে প্রায় ১৩০ টাকা। একজন রোগীর প্রথম ধাপে একটি ডোজের প্রয়োজন হয়। তাই অভিভাবকদের সাধারণত চারজন মিলে এক প্যাকেট কিনতে হয়। এছাড়া ‘আরআইজি’ ভ্যাকসিনের জন্য ১ হাজার টাকা গুণতে হয়, যা রোগীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
হাসপাতালের পুরাতন ভবনের জরুরি বিভাগটি এখন জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সোমবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষের দরজার পাশে লেখা রয়েছে ‘বর্তমানে সরকারি রেবিস (জলাতঙ্ক) ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রোগীদের উক্ত ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো’। কক্ষের ভেতরে প্রবেশের পর কাঁচ দিয়ে ঘেরা কাউন্টারের সামনেও লেখা ‘সরকারি ভ্যাকসিন সাপ্লাই বন্ধ’। কাউন্টারের পাশে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে তাদের স্বজন ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করছেন।
শিশু মাহির আহানাফের মা হোসনে আরা বলেন, ছেলেকে বিড়াল আঁচড় দিয়েছে। ভ্যাকসিন দিতে দুপুর সাড়ে ১২টায় এসেছি। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে বসে আছি। সরকারিভাবে ভ্যাকসিন নেই, কিনতে হবে। এদিকে চারজন ছাড়া কেনা যাবে না। টাকা হাতে নিয়ে বসে আছি। আমার ছেলেসহ দুইজন হয়েছে, আরও দুইজন প্রয়োজন। তাদের অপেক্ষায় আছি। সরকারিভাবে এই ভ্যাকসিন পেলে সুবিধা হতো।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক জুয়েল বলেন, গত ডিসেম্বরের পর থেকে সরকারি পর্যায়ে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে আমরা রোগীদের বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিতে পারছি না। রোগীদের বাইরে থেকে সংগ্রহ করে নেওয়ার পরামর্শ দিতে হচ্ছে, যা আমাদের জন্যও দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী আসছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সরবরাহ চালু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।



