‘সবই আছে, শুধু আমার ছেলেটা নেই’, জুলাইয়ে নিহত জাকিরের মা

বাংলা টিভি ডেস্ক: দুপুরের পরের নরম রোদ এসে পড়েছে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বাকলজোড়া গ্রামের ছোট্ট কবরস্থানে। একটি কবরের পাশে নীরবে বসে আছেন মিছিলি বেগম। কখনো ছেলের কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখছেন, আবার কখনো বুকে জড়িয়ে ধরছেন জাকির হোসেনের পুরোনো একটি জামা। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও একমাত্র সন্তান আর কোনো দিন ফিরে আসবে না—এ সত্য এখনো মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
বাকলজোড়া গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন (২৪) ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার কাঁচপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সংঘর্ষের মধ্যে কাজ শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে নাশতা করতে যাওয়ার সময় গুলির শিকার হন তিনি।
জাকিরের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, ছেলের কবরের পাশেই বসে আছেন তার মা মিছিলি বেগম। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
মিছিলি বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই ছেলেকে নিয়ে তার জীবন ছিল সংগ্রামের। মানুষের বাড়িতে কাজ করে এবং রাস্তায় ভাঙারি সংগ্রহ করে তিনি জাকিরকে বড় করেছেন। ভেবেছিলেন, একসময় কষ্টের দিন শেষ হবে। কিন্তু একটি গুলিই তার সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে।
জাকিরের বাবা ফজলু মিয়া মারা যান যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর। কোনো জমিজমা না থাকায় স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেকে নিয়ে ঢাকার বাড্ডা নতুন বাজার এলাকায় চলে যান মিছিলি বেগম। সেখানে গৃহকর্মীর কাজের পাশাপাশি ভাঙারি সংগ্রহ করে সংসার চালাতেন তিনি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন জাকিরও। প্রথমে ভাঙারি সংগ্রহের কাজ করলেও পরে দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করেন। কয়েক বছর ধরে ঠিকাদারের অধীনে কাঁচপুর এলাকায় ওয়াসার পানির লাইন মেরামতের কাজ করছিলেন তিনি। তার আয়ে ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছিল মা-ছেলের জীবন।
মিছিলি বেগম জানান, জাকির প্রায়ই বলতেন, “মা, আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না।” কিছু টাকা জমিয়ে গ্রামের বাড়িতে ১৫ শতক জমি কিনেছিলেন তিনি। সেই জমিতে একটি ঘর তৈরি করে মাকে নিয়ে থাকার স্বপ্ন ছিল তার।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময় কয়েক দিন বাড়িতে না ফেরায় জাকির মাকে ফোন করে বলেছিলেন, পরিস্থিতি ভালো নয়, রাস্তায় গুলি চলছে। ২১ জুলাই বিকেলে কাজ শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে একটি চায়ের দোকানে গেলে সেখানে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। আহত অবস্থায় একটি গলিতে গিয়ে পড়ে যান এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
সেদিন রাতেই সহকর্মীরা জাকিরের মরদেহ বাড্ডার বাসায় নিয়ে যান। পরে মিছিলি বেগম ছেলের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। পরদিন জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয় সেই জমিতেই, যেখানে একদিন মা-ছেলের স্বপ্নের ঘর তৈরি হওয়ার কথা ছিল।
মিছিলি বেগম বলেন, “যে জায়গায় ঘর করার কথা ছিল, এখন সেখানেই আমার ছেলে শুয়ে আছে। প্রতিদিন কবরের পাশে বসে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি ফিরে আসবে। সব আছে, শুধু আমার ছেলেটা নেই।”
জাকিরের খালাতো ভাই এন্টাস মিয়া বলেন, আন্দোলনের সময় জাকির নিয়মিত আত্মীয়দের সাবধানে চলাফেরা করার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই আর ফিরে আসতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর মিছিলি বেগমের জীবন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে।
প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান জানান, স্বামী হারানোর পর মিছিলি বেগম অনেক কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছিলেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখন তিনি সম্পূর্ণ একা।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, জুলাই আন্দোলনে নিহত জাকির হোসেনের পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তার মায়ের নামে ১০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সহায়তাও পরিবারটি পেয়েছে।



