ধর্ম

যেখানে রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ, তবু এত দুশ্চিন্তা কিসের?

বাংলা টিভি ডেস্ক: মানুষ স্বভাবতই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। কাল কী হবে, সংসার কীভাবে চলবে, সন্তানের খরচ কোথা থেকে আসবে, এসব চিন্তা প্রায় প্রতিটি মানুষের মনে ঘুরপাক খায়। তবে ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, রিজিক নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা কাম্য নয়। কারণ রিজিক মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে রখেছেন। সুতরাং মানুষের জীবিকা নির্ধারিত। যতক্ষণ তার জীবন আছে, ততক্ষণ তার রিজিকও অব্যাহত থাকবে। তাই রিজিক নিয়ে ভয়, আতঙ্ক বা হতাশায় ভোগা ইমানদারের কাজ নয়। তবে আমাদের তা পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। আমাদের উচিত আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং অবৈধ পথ থেকে দূরে থাকা।

রিজিকের জন্য চেষ্টা করার নির্দেশ

ইসলাম মানুষকে কর্মবিমুখ হতে শেখায় না। বরং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন—

আরবি:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

উচ্চারণ: ফা ইযা কুদিয়াতিস সালাতু ফান্তাশিরু ফিল আরদি ওয়াবতাগু মিন ফাদলিল্লাহি ওয়াজকুরুল্লাহা কাছিরাল্লা আল্লাকুম তুফলিহূন।

অর্থ: “অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) অনুসন্ধান করো। আর বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পার।” (সুরা আল-জুমু’আহ, আয়াত: ১০)

আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলেই যথেষ্ট

প্রত্যেক প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—

আরবি:

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا

উচ্চারণ: ওয়া মা মিন দাব্বাতিন ফিল আরদি ইল্লা আলাল্লাহি রিযকুহা।

অর্থ: “পৃথিবীর এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ রয়েছে।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)

রিজিকের উৎস আল্লাহর কাছেই

মহান আল্লাহ বলেন—

আরবি:

وَفِي السَّمَاءِ رِزْقُكُمْ وَمَا تُوعَدُونَ

উচ্চারণ: ওয়া ফিস সামা-ই রিযকুকুম ওয়া মা তূআদূন।

অর্থ: “আকাশেই রয়েছে তোমাদের রিজিক এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত সবকিছু।” (সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ২২)

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—

আরবি:

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ

উচ্চারণ: ইন্নাল্লাহা হুওয়ার রাজ্জাকু যুল কুওয়াতিল মাতীন।

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহই একমাত্র রিজিকদাতা। তিনি মহাশক্তিধর ও পরাক্রমশালী।” (সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৮)

রিজিক কম-বেশি হওয়াও আল্লাহর পরীক্ষা

অনেক সময় মানুষ কঠোর পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত আয় করতে পারে না। আবার কেউ অল্প চেষ্টায় অনেক কিছু পেয়ে যায়। ইসলাম শেখায়, এটিও আল্লাহর পরীক্ষা।

মহান আল্লাহ বলেন—

আরবি:

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

অর্থ: “আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৫)

আল্লাহ আরও বলেন—

আরবি:

إِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ

অর্থ: “নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক যাকে ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যাকে ইচ্ছা সীমিত করে দেন।” (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৩০)

আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি যথেষ্ট

রিজিক নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করার নির্দেশ দিয়েছে কোরআন।

আরবি:

وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

উচ্চারণ: ওয়া মান ইয়াতাওয়াক্কাল আলাল্লাহি ফাহুওয়া হাসবুহু।

অর্থ: “আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সুরা আত-তালাক, আয়াত: ৩)

আল্লাহ আরও বলেন—

আরবি:

أَمَّنْ هَذَا الَّذِي يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُ

অর্থ: “তিনি যদি তাঁর রিজিক বন্ধ করে দেন, তবে কে আছে যে তোমাদের রিজিক দেবে?” (সুরা আল-মুলক, আয়াত: ২১)

রিজিক শুধু অর্থ নয়

ইসলামি শিক্ষায় রিজিক বলতে শুধু টাকা-পয়সা বা খাবারকে বোঝানো হয়নি। সুস্থ শরীর, ঈমান, জ্ঞান, নেক সন্তান, ভালো পরিবার, মানসিক শান্তি, সময় ও সম্মান—এসবও আল্লাহর দেওয়া মূল্যবান রিজিক।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে প্রচুর রিজিক দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। তাই তিনি যাকে যতটুকু ইচ্ছা, ততটুকুই রিজিক দান করেন।” (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ২৭)

রিজিক পূর্ণ না করে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না

রিজিক নিয়ে হাদিসেও এসেছে সুস্পষ্ট আশ্বাস। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—

“হে মানুষ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম উপায়ে জীবিকা অনুসন্ধান করো। কেননা কোনো মানুষ তার নির্ধারিত রিজিক পূর্ণভাবে লাভ করার আগে মৃত্যুবরণ করবে না, যদিও তা পেতে দেরি হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)

ইসলাম মানুষকে অলসতা নয়, পরিশ্রমের শিক্ষা দেয়। তবে সেই পরিশ্রম হতে হবে হালাল পথে। একই সঙ্গে বিশ্বাস রাখতে হবে, রিজিকের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি যাকে যতটুকু কল্যাণ মনে করেন, ততটুকুই দান করেন। তাই রিজিক নিয়ে হতাশ না হয়ে, হালাল উপায়ে চেষ্টা করা, বেশি বেশি দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখাই একজন মুমিনের জন্য সর্বোত্তম পথ।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button