এক সপ্তাহে মালদ্বীপে ৮ বাংলাদেশির মৃত্যু: উদ্বেগ বাড়ছে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে

সোহেল রানা, মালদ্বীপ প্রতিনিধি: জীবিকার তাগিদে প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি পাড়ি জমান মালদ্বীপে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে একের পর এক বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু উদ্বেগের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মস্থলের দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, আত্মহত্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত জটিলতায় মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আটজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। ধারাবাহিক এসব মৃত্যুর ঘটনায় শোকের পাশাপাশি প্রবাসীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা, কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারানো আটজনের মধ্যে রয়েছেন কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় নিহত, স্ট্রোকে আক্রান্ত, আত্মহত্যার ঘটনা এবং হৃদরোগে মৃত্যুবরণকারী প্রবাসীরা।
নিহতদের মধ্যে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ২৩ বছর বয়সী রবিউল ইসলাম রওশন মাত্র সাত মাস আগে জীবিকার উদ্দেশ্যে মালদ্বীপে আসেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ জুলাই কর্মস্থলে মিক্সার মেশিনের সঙ্গে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তার মৃত্যু হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ৪৫ বছর বয়সী হুমায়ুন কবির দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে একটি রিসোর্টে কর্মরত ছিলেন। ২৭ জুলাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে স্ট্রোকজনিত কারণে মৃত ঘোষণা করেন।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ২১ বছর বয়সী সোলাইমান মাতব্বর দেড় বছর আগে মালদ্বীপে আসেন। স্বজনদের দাবি, ১ আগস্ট কর্মস্থলে ভুলবশত তারপিন পান করার পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ৪৪ বছর বয়সী সায়েদ মোল্লা দুই দশক ধরে মালদ্বীপে কর্মরত ছিলেন। গত ১ আগস্ট নিজ কক্ষে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ৩৭ বছর বয়সী বদিউর রহমান প্রায় ১০ বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। ১ আগস্ট নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছে পরিবার। ঘটনাটি বর্তমানে মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ৪৫ বছর বয়সী শেখ ফরিদ দুই বছর আগে মালদ্বীপে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন তিনি। ৩০ জুলাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর স্ট্রোকজনিত কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ৪৭ বছর বয়সী মকবুল মিয়া প্রায় ২০ বছর ধরে মালদ্বীপে কর্মরত ছিলেন। ২৮ জুলাই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এছাড়া ৩ আগস্ট রাতে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ৭০ বছর বয়সী দেলওয়ারা নবি। তিনি মালদ্বীপের থ্রি টপ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ডা. নবির সহধর্মিণী। তার বাড়ি বরিশালে।
নিহতদের স্বজনরা দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মালদ্বীপে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জরুরি সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে মালদ্বীপে বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, আটজনের মৃত্যুর বিষয়েই তারা অবগত রয়েছেন। ইতোমধ্যে হুমায়ুন কবির ও সায়েদ মোল্লার মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রেও পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এক সপ্তাহে পরপর আটজন বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় মালদ্বীপে বসবাসরত প্রবাসী সমাজে গভীর শোক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মরহুমদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে স্বাস্থ্যসচেতনতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।



