১৪ কোটি টাকার সড়কে ঢালাইয়ের পরই ফাটল, ঠিকাদার বললেন ‘মাটি ভালো নয়’

বাংলা টিভি ডেস্ক: দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পর নতুন সড়কের প্রত্যাশা করেছিলেন রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলার বাসিন্দারা। প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক পুনর্বাসনের কাজ শুরু হলেও এরই মধ্যে ঢালাই করা অংশে ফাটল ও কোথাও কোথাও দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের নিচের মাটি যথাযথভাবে শক্ত করা হয়নি। প্রয়োজনীয়ভাবে রোলার চালানো হয়নি এবং কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢালাইয়ের পুরুত্বও নির্ধারিত মানের চেয়ে কম বলে অভিযোগ তাদের।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী। তার দাবি, নির্মাণসামগ্রীর মানে কোনো সমস্যা নেই। মূলত সড়কের নিচের মাটি ‘অর্গানিক সয়েল’ হওয়ায় পানি পেলে এর ভার বহনক্ষমতা কমে যায়। ফলে ওপরের অংশের চাপ সামলাতে না পেরে মাটি দেবে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও ভারী যানবাহন চলাচলও সড়কের ক্ষতির কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে জানান তিনি।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ‘বায়া-কাশিম বাজার-তানোর সড়ক পুনর্বাসন কাজ (প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ)’ প্রকল্পের আওতায় ৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। গত ৯ মে কাজ শুরু হয়েছে এবং ২০২৭ সালের ১২ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে পবার বায়া থেকে তানোরের আগপর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন অংশে পুনর্বাসনের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার অংশে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। তবে ওই ঢালাইয়ের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা গেছে। ফাটল ধরা অংশে কাজ বন্ধ থাকলেও সড়কের অন্য অংশে নির্মাণকাজ চলছিল।
বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. কুরবান আলীর অভিযোগ, কিছু অংশে অপরিষ্কার জায়গার ওপরই ঢালাই দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, নিচের মাটিও ভালোভাবে শক্ত করা হয়নি এবং রোলার যথাযথভাবে চালানো হয়নি। ফাটল ধরা অংশ তুলে নিচের মাটি শক্ত করে নতুন করে ঢালাই দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজমুল হুদা মোল্লার অভিযোগ, গর্ত খননের পর মাটি যথাযথভাবে কমপ্যাক্ট করা হয়নি। রোলার না চালানোর কারণে কোথাও সড়ক দেবে গেছে এবং কোথাও ফাটল দেখা দিয়েছে। ঢালাইয়ের পুরুত্ব ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুস সালামও নির্মাণকাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের কাজ আরও ভালোভাবে করা প্রয়োজন। একই অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জলিল ও মো. সিরাজুল ইসলাম। তাদের দাবি, নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং ইট ও রডের কাজেও ত্রুটি রয়েছে।
বাকসাড়া-নওদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, নির্মাণকাজের সময় তিনি প্রকৌশলীদের মাটি শক্ত করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তার অভিযোগ, মাটি যথেষ্ট শক্ত করা হয়নি। ঢালাইয়ের সময় প্রয়োজনীয় কম্প্যাকশন বা ভাইব্রেশনের যন্ত্রও ব্যবহার করা হয়নি।
তবে পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী জানান, সড়কের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পের নকশা সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। মাটির ভার বহনক্ষমতা, বৃষ্টির পানি এবং ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়কের কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাব অনুযায়ী ৩ ইঞ্চি সিসি ঢালাইয়ের পাশাপাশি ১২ ইঞ্চি আরসিসি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে দুই স্তরের রডের জালি এবং কর্নার বার বা কর্নার রড ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিষয়টি জানেন এবং সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেছেন বলেও জানান তিনি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুয়েল ইলেকট্রনিক্সের ঠিকাদার মো. ইউনুস আলীর ভাষ্য, ঢালাই দেওয়ার পর অন্তত ২৮ দিন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হওয়ায় ঢালাই করা অংশ দিয়ে ভারী যান চলাচল করায় ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।
তার দাবি, ওই এলাকার মাটি নির্মাণকাজের জন্য উপযোগী নয়—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আপত্তিও জানানো হয়েছিল। তবে সেই আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।



