রেলের টিকিটের টাকা সরকারের ঘরে ফেরাতে অ্যাপ বানালেন এক শিক্ষার্থী

বাংলা টিভি ডেস্ক: অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কেনার সময় প্রতিটি আসনের বিপরীতে যাত্রীদের ২০ টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। এই অর্থের একটি অংশ চলে যায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এমন পরিস্থিতি পরিবর্তন করে পুরো টিকিটিং ব্যবস্থাকে সরকারের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটির (ডিআইআইটি) শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম মোল্লা। এ লক্ষ্যে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ টিকিটিং অ্যাপ তৈরি করেছেন। অ্যাপটি কোনো মূল্য ছাড়াই সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে চান তিনি।
ইব্রাহিম জানান, রেলের টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন যৌথ উদ্যোগ পরিচালনা করছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
বর্তমান ব্যবস্থায় অনলাইনে প্রতিটি টিকিট কেনার জন্য যাত্রীকে ২০ টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। এর মধ্যে ৬ টাকা ৫০ পয়সা পায় পরিচালনাকারী যৌথ উদ্যোগ। বাকি অর্থ ব্যয় হয় ভ্যাট, ব্যাংক এবং বিকাশ-নগদের মতো পেমেন্ট সেবার খরচ হিসেবে। অন্যদিকে, কাউন্টার থেকে বিক্রি হওয়া প্রতিটি টিকিটের বিপরীতেও প্রতিষ্ঠানটি ২৫ পয়সা কমিশন পায়।
রেলওয়ের দৈনিক গড়ে প্রায় দুই লাখ টিকিট বিক্রি হয়। এর প্রায় অর্ধেক অনলাইনে বিক্রি হওয়ায় শুধু অনলাইন টিকিটের কমিশন বাবদ বছরে ১২ থেকে ২৪ কোটি টাকা বেসরকারি অপারেটরের কাছে যাচ্ছে বলে হিসাব তুলে ধরেছেন ইব্রাহিম।
এ ছাড়া টিকিট কালোবাজারি এবং যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে থাকার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ বলে মনে করেন তিনি।
চলতি বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি অডিটে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু দুর্বলতা ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, স্বয়ংক্রিয় বট ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো আটকে রাখা হতো। পরে এসব টিকিট বেশি দামে বিক্রি করা হতো।
অডিটে প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্টের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। পাশাপাশি অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট বিক্রির নির্ধারিত সময়ের কয়েক দিন আগেই আসন আটকে রাখার সুযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে তাদের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছে।
এদিকে টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক করেছে রেলওয়ে। একই সঙ্গে অননুমোদিত ওয়েবসাইট বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
ইব্রাহিমের তৈরি অ্যাপের প্রস্তাবের সঙ্গে রেলওয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনারও মিল রয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে আগেই জানানো হয়েছিল, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সহজের সঙ্গে চুক্তি নবায়নের পরিকল্পনা নেই। নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ গড়ে তুলতে ৪৯টি পদ অনুমোদনের কথাও জানানো হয়েছে।
তৎকালীন রেল সচিব ড. হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায় রেলওয়ে। এর ফলে টিকিটিং ব্যবস্থায় কারসাজি ও যাত্রীদের তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী চুক্তি স্থগিত এবং চুক্তির শর্ত প্রকাশের দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ভেন্ডর নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
নিজের তৈরি অ্যাপ সম্পর্কে ইব্রাহিম বলেন, এটি ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে। রেলওয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে নতুন ফিচার যুক্ত করা কিংবা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব। সরকারকে বিনামূল্যে অ্যাপটি দেওয়ার পরও মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ দিতে আগ্রহী তিনি।
ইব্রাহিমের মতে, রেলওয়ে যদি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকিট বিক্রি শুরু করে, তাহলে বেসরকারি অপারেটরকে দেওয়া কমিশনের অর্থ সরকারের কোষাগারেই জমা হবে। এতে রেলওয়ের জন্য অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া সার্ভিস চার্জ কমিয়ে আনার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, টিকিটিং ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে যাত্রীদের ব্যক্তিগত ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্যও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেলওয়ের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রচলন রয়েছে। ভারতের রেল মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সংস্থা আইআরসিটিসি অনলাইন টিকিটিং পরিচালনা করে। টিকিটিং সফটওয়্যার তৈরির দায়িত্বে রয়েছে রেলের নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ক্রিস। সেখানে বেসরকারি ওয়েবসাইটগুলো মূলত এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
পাকিস্তানে রেল মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পোর্টালের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে পেমেন্ট সেবা দিয়ে থাকে। শ্রীলঙ্কাতেও সরকারি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
ইউরোপের জার্মানিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডয়চে বান নিজেদের ওয়েবসাইট ও ডিবি নেভিগেটর অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করে। ফ্রান্সে এসএনসিএফ কানেক্ট অ্যাপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় কোরেইলের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহার করে যাত্রীরা টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন।
চীনেও রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে গ্রুপ পরিচালিত ১২৩০৬ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হয়, যেখানে কোনো বুকিং ফি নেওয়া হয় না।
তবে সব দেশে একই ধরনের ব্যবস্থা নেই। নাইজেরিয়ায় সরকারি রেলওয়ের ই-টিকিটিং ব্যবস্থা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পিপিপি চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে টিকিটের প্রাপ্যতা ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালন লোকসানের মুখে রয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরের হিসাবেও বড় অঙ্কের লোকসানের চিত্র দেখা যায়।
- ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসান প্রায় ১ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
- ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসান প্রায় ২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।
- ২০২২-২৩ অর্থবছরে লোকসান ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি।
- ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান প্রায় ২ হাজার ৭৩ কোটি টাকা।
- ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা বলে সংসদে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী।
এমন পরিস্থিতিতে টিকিটিং ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় কমানো এবং রাজস্ব বাড়ানোর সম্ভাব্য উপায় হিসেবে নিজস্ব অ্যাপ চালুর প্রস্তাব সামনে এনেছেন ইব্রাহিম।
ইব্রাহিম মোল্লা জানান, তৈরি করা অ্যাপটি বিনামূল্যে সরকারের কাছে হস্তান্তরের আগ্রহ জানিয়ে রেলমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাননি।
তিনি বলেন, একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা থেকেই নিজের তৈরি প্রযুক্তি সরকারের হাতে তুলে দিতে চান। তাঁর প্রত্যাশা, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগটি বিবেচনা করে যাত্রীসেবায় অ্যাপটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।



