সব বোর্ডেই বাজিমাত ছাত্রীদের, পাসের হারে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে ছাত্ররা

বাংলা টিভি ডেস্ক: ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে অংশগ্রহণ, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পাসের হার—তিন ক্ষেত্রেই ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি—সব বোর্ডেই পাসের হারে ছাত্রীদের সাফল্য বেশি।
বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের নয়টিতেই ছাত্রদের পেছনে ফেলেছে ছাত্রীরা। বিভাগীয় বোর্ডগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে দুই পক্ষের পাসের হারে বড় ব্যবধানও দেখা গেছে।
অংশগ্রহণ ও পাসের সংখ্যায় এগিয়ে ছাত্রীরা
এবার সারাদেশে মোট ১২ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৮ জন ছাত্রী এবং ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, মোট ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রী ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন এবং ছাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬.৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের পাসের হার ৪৭.৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ৮.৫৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডের সম্মিলিত পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। অন্যদিকে শুধু সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ। এসব বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই মেয়েদের সাফল্য
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিটি বোর্ডেই ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার বেশি। সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে বরিশাল বোর্ডে।
বরিশাল বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৩৫.৩৮ শতাংশ। বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ৫২.৯৭ শতাংশ। দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান ১৭.৫৯ শতাংশ পয়েন্ট। এ বোর্ডে ২৬ হাজার ৭৫৫ জন ছাত্রের মধ্যে ৯ হাজার ৪৬৫ জন এবং ৩১ হাজার ১৫৭ জন ছাত্রীর মধ্যে ১৬ হাজার ৫০৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বোর্ডটির সার্বিক পাসের হার ৪৪.৮৪ শতাংশ।
রাজশাহী বোর্ডেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ছাত্রদের পাসের হার ৩৭.৭১ শতাংশ হলেও ছাত্রীদের ক্ষেত্রে তা ৫৩.০৩ শতাংশ। এ বোর্ডে ৭১ হাজার ৪২৮ জন ছাত্রের মধ্যে ২৬ হাজার ৯৮৩ জন এবং ৬৫ হাজার ৯২৮ জন ছাত্রীর মধ্যে ৩৪ হাজার ৮৯১ জন পাস করেছে। রাজশাহী বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৪৫.০৬ শতাংশ।
রাজধানী ঢাকার বোর্ডেও ছাত্রীদের ফলাফল তুলনামূলক ভালো। ঢাকা বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৬০.০৩ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৬২.৫২ শতাংশ। এ বোর্ডে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৫ জন ছাত্রের মধ্যে ৮১ হাজার ৮৩৯ জন এবং ১ লাখ ৬৩ হাজার ২৯৬ জন ছাত্রীর মধ্যে ১ লাখ ২ হাজার ৯১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বোর্ডটির সার্বিক পাসের হার ৬১.৩৮ শতাংশ।
চট্টগ্রাম বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৪৮.৮৩ শতাংশ, যেখানে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৪.৫৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪১ হাজার ৬৬৪ জন ছাত্রের মধ্যে ২০ হাজার ৩৪৪ জন এবং ৫৪ হাজার ৬৭১ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৯ হাজার ৮২২ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এ বোর্ডে মোট পাসের হার ৫২.০৭ শতাংশ।
ময়মনসিংহ বোর্ডে ৩৩ হাজার ৩৭ জন ছাত্রের মধ্যে ১৫ হাজার ৬৪৭ জন পাস করেছে। ফলে ছাত্রদের পাসের হার ৪৭.৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৭ হাজার ৬৩৬ জন ছাত্রীর মধ্যে ২০ হাজার ৭০৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫.০২ শতাংশ। এ বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৫১.৪৪ শতাংশ।
সিলেট বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৪৮.৭২ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৫২.৩৮ শতাংশ। সেখানে ২৮ হাজার ৯৩৫ জন ছাত্রের মধ্যে ১৪ হাজার ৯৬ জন এবং ৪২ হাজার ৯৫৪ জন ছাত্রীর মধ্যে ২২ হাজার ৫০১ জন পাস করেছে। বোর্ডটির সম্মিলিত পাসের হার ৫০.৯০ শতাংশ।
দিনাজপুর বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৪১.৩১ শতাংশ। এ বোর্ডে ৫৩ হাজার ৫০৮ জন ছাত্রের মধ্যে ২২ হাজার ১০৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ৫৮ হাজার ২৭৯ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৯ হাজার ২৯২ জন পাস করায় তাদের পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫০.২৬ শতাংশে। দিনাজপুর বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৪৫.৯৮ শতাংশ।
কুমিল্লা বোর্ডেও ছাত্রীদের সাফল্য বেশি। সেখানে ছাত্রদের পাসের হার ৪৩.১৭ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৫১.২৬ শতাংশ। এ বোর্ডে ৩৬ হাজার ৭২৮ জন ছাত্রের মধ্যে ১৫ হাজার ৮৫৭ জন এবং ৫৫ হাজার ৪৬৪ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৮ হাজার ৪১৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। সার্বিক পাসের হার ৪৭.৯৮ শতাংশ।
যশোর বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৩৯.২৩ শতাংশ হলেও ছাত্রীদের পাসের হার ৫০.৩০ শতাংশ। সেখানে ৫৪ হাজার ৮১১ জন ছাত্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০২ জন এবং ৫৭ হাজার ৯৮০ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৯ হাজার ১৬৬ জন পাস করেছে। এ বোর্ডে মোট পাসের হার ৪৪.৯২ শতাংশ।
মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডেও এগিয়ে ছাত্রীরা
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলও ছাত্রীদের এগিয়ে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় ছাত্রীদের পাসের হার ৬৪.৯০ শতাংশ। অন্যদিকে ছাত্রদের পাসের হার ৫৮.১০ শতাংশ। এ বোর্ডে ৫০ হাজার ৭৪ জন ছাত্রের মধ্যে ২৯ হাজার ২৬৯ জন এবং ৩৮ হাজার ৯৪৭ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৫ হাজার ২৭৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বোর্ডটির সামগ্রিক পাসের হার ৬১.০৭ শতাংশ।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে দুই পক্ষের পাসের হারের ব্যবধান আরও বেশি। এ বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার ৪৪.৬৮ শতাংশ হলেও ছাত্রীদের ক্ষেত্রে তা ৬১.৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ এখানে মেয়েরা প্রায় ১৭ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে।
কারিগরি বোর্ডে ৭৪ হাজার ৮৪ জন ছাত্রের মধ্যে ৩৩ হাজার ৯৯ জন এবং ২৮ হাজার ৮৬৩ জন ছাত্রীর মধ্যে ১৭ হাজার ৭৯৬ জন পাস করেছে। এ বোর্ডে সম্মিলিত পাসের হার ৪৯.৪৩ শতাংশ।
পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ৩৯ হাজার ৬৫১ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এর মধ্যে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে অনুপস্থিত ছিল ২৯ হাজার ৭৭৫ জন।
বোর্ডভিত্তিক হিসাবে ঢাকায় ৩ হাজার ৭৪৭ জন, রাজশাহীতে ৪ হাজার ৫৮০ জন, কুমিল্লায় ২ হাজার ৯০১ জন, যশোরে ৪ হাজার ৭১৯ জন, চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৫৪৪ জন, বরিশালে ২ হাজার ৭৩০ জন, সিলেটে ১ হাজার ৬২ জন, দিনাজপুরে ৩ হাজার ৭০৪ জন এবং ময়মনসিংহে ২ হাজার ৭৪৭ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।
এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪ হাজার ১৫০ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫ হাজার ৭২৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
সব বোর্ড মিলিয়ে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা ২০ হাজার ৪৮৩ জন এবং ছাত্রীর সংখ্যা ১৯ হাজার ১৬৮ জন।
২ জুলাই শুরু হয়েছিল পরীক্ষা
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় গত ২ জুলাই। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে গত ৯ সেপ্টেম্বর ওই বোর্ডের পরীক্ষা শেষ হয়।
এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছাত্রী। সারাদেশের ২ হাজার ৬৯১টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা।
সার্বিক ফলাফলে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে পাসের হার—সব ক্ষেত্রে



