এক সেট বইয়ে পড়াশোনা, যমজ বোনের জিপিএ ৫

বাংলা টিভি ডেস্ক: একই দিনে পৃথিবীতে এসেছে দুই বোন। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা, এমনকি আর্থিক সংকটের কারণে ভাগাভাগি করে পড়েছে একই বই। সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি—দুই পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে যমজ দুই বোন আয়েশা আক্তার তোয়া ও খাদিজা আক্তার তানহা।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার আস্করপুর গ্রামের তুফান আলী ও সালমা বেগম দম্পতির সন্তান তারা। দুজনই সরদহ সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তাঁদের এমন সাফল্যে পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা।
তোয়া ও তানহার বাবা তুফান আলী পেশায় একজন রডমিস্ত্রি। পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। বাড়ির সামান্য ভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো জমিজমা নেই। দিনমজুরির আয় দিয়েই সংসারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে হয় তাঁকে।
রোববার (২ নভেম্বর) আস্করপুর গ্রামে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট মাটির ঘরেই পরিবারের সবার বসবাস। সীমিত সামর্থ্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দুই বোন পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের স্বপ্ন, একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেওয়া। ভবিষ্যতে সরকারি কলেজের শিক্ষক হয়ে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে চান তাঁরা।
আয়েশা আক্তার তোয়া বলেন, পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় দুই বোন একই বই ভাগাভাগি করে পড়েছেন। স্কুল ও কলেজের শিক্ষকেরাও তাঁদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। এখন তাঁদের ইচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো কোনো বিষয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করা।
খাদিজা আক্তার তানহা জানান, ভবিষ্যতে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতে চান তাঁরা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মা-বাবা তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করার পাশাপাশি তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চান দুই বোন।
তবে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত মা সালমা বেগম। তিনি বলেন, দুই মেয়ে সব সময় একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে এবং প্রতিটি শ্রেণিতেই ভালো ফল করেছে। এইচএসসিতেও দুজন জিপিএ-৫ পাওয়ায় পরিবারের সবাই আনন্দিত। কিন্তু সংসারে স্বামীর উপার্জন ছাড়া আর কোনো আয় নেই। দৈনন্দিন খাবারের খরচ মেটাতেই আয়ের বেশির ভাগ অর্থ শেষ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, রাজশাহীর বাইরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের নেই। এ কারণে মেয়েরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে তাদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
কাজের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে থাকা বাবা তুফান আলী মুঠোফোনে বলেন, রডমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। মেয়েদের ভালো ফলাফলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাঁর তিন মেয়েই তাঁর কাছে সমান আদরের। সন্তানদের পড়াশোনা যেন কোনো কারণে বন্ধ না হয়, সেটিই তাঁর একমাত্র চাওয়া।
সরদহ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সামসুল হক বলেন, তোয়া ও তানহা অত্যন্ত মেধাবী, নম্র ও বিনয়ী শিক্ষার্থী। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁদের এই অর্জন অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। সরকারি পর্যায় থেকে তাঁদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। কলেজ কর্তৃপক্ষও যথাসাধ্য পাশে থাকার চেষ্টা করবে।
অধ্যক্ষ আরও আশা প্রকাশ করেন, দুই বোনের অধ্যবসায় ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে তাঁরা একদিন নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।



