আধুনিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের পথে বাধা নয় ইসলাম: মাহাথির মোহাম্মদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদ আধুনিক মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী ও আলোচিত রাজনৈতিক নেতাদের একজন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ, ইসলামি সভ্যতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আধুনিকায়ন এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মুসলিম সমাজের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে ইসলামকে শান্তি, সহনশীলতা, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণের ধর্ম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, নেতৃত্বের দুর্বলতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়া এবং উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেছেন তিনি।
মাহাথিরের চিন্তাধারার অন্যতম দিক হলো, তিনি ইসলাম ও আধুনিকতাকে পরস্পরের বিরোধী মনে করেন না। তার দৃষ্টিতে, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করেই মুসলিম সমাজ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। অতীতের মুসলিম সভ্যতার অর্জনকে স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমান মুসলিম সমাজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
ইসলাম শান্তি ও মধ্যপন্থার শিক্ষা দেয়
২০০২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘দ্য রোল অব ইসলাম ইন দ্য মডার্ন স্টেট’ শীর্ষক বক্তব্যে মাহাথির মোহাম্মদ ইসলামকে শান্তি ও মধ্যপন্থার ধর্ম হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, বর্তমানে বিশ্বের কোথাও ইসলামকে শান্তি ও সহনশীলতার ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা না হলে এর জন্য ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দায়ী নয়; বরং কিছু মানুষের স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যা ও অপব্যবহারই এর কারণ।
তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামের মূলনীতি শান্তি, মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব এবং নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষার পক্ষে। ইসলাম আগ্রাসন কিংবা নিরীহ মানুষ হত্যার অনুমোদন দেয় না। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধের সুযোগ থাকলেও প্রতিপক্ষ শান্তির প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করার ইতিবাচক মনোভাব মুসলমানদের থাকা উচিত।
ইসলামকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার প্রবণতার বিরোধিতা করেছেন মাহাথির। তার মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে একটি ধর্মের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করা ঠিক নয়। ধর্মের অনুসারীদের বিচ্যুতি ও অপরাধকে ধর্মের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
তিনি মনে করেন, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করা হলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। একই সঙ্গে অমুসলিম দেশগুলোর সঙ্গেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। তার বক্তব্যে ইসলামকে শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র ও সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনের পথে ইসলাম বাধা নয়
ইসলাম এবং আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়ে মাহাথিরের চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখেও আধুনিক উন্নয়ন সম্ভব। ২০০৪ সালের ১৪ মার্চ সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ইসলাম পরিবর্তনের বিরোধী নয়। ইসলামকে আধুনিকায়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করা হলে বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে সমস্যা রয়েছে।
পরদিন ‘আরব নিউজ’ তার বক্তব্যের শিরোনাম প্রকাশ করে, ‘ইসলাম ইজ নো ব্যারিয়ার টু চেঞ্জ অ্যান্ড মডার্নাইজেশন’। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, মাহাথিরের মতে, কোনো দেশকে আধুনিক হওয়ার পথে ইসলাম বাধা দেয় না। বরং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন গ্রহণ করা এবং নিজেরাই উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি।
মালয়েশিয়ার উন্নয়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেও একটি দেশ শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও প্রশাসনে উন্নতি করতে পারে।
তার বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, আধুনিক হওয়ার জন্য ধর্মীয় পরিচয় বিসর্জন দেওয়া জরুরি নয়। আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা সময়োপযোগী পরিবর্তন থেকে দূরে থাকাও সমর্থনযোগ্য নয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক অবদান
মাহাথির মোহাম্মদ মুসলিম সভ্যতার অতীত অর্জনকে বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। ২০০৩ সালের ১০ জুলাই মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বিশ্ব উলামা সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, একসময় মুসলিম সমাজ বিশ্বজুড়ে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম সভ্যতার অগ্রগতি বিশ্বের অন্যান্য সমাজকেও প্রভাবিত করেছিল।
তিনি গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন শাখায় মুসলিম মনীষীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তার মতে, এসব অর্জনের সঙ্গে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহির নির্দেশ ছিল ‘ইকরা’ বা পড়ো। মাহাথির এই নির্দেশের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন, অধ্যয়ন ও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ জ্ঞান অর্জনের জন্য মুসলিম পণ্ডিতদের দ্বারস্থ হতেন। গ্রিক, পারস্য, ভারতীয় ও চীনা জ্ঞানভান্ডারের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। মুসলিম পণ্ডিতেরা এসব জ্ঞান অধ্যয়ন করার পাশাপাশি নতুন গবেষণা ও আবিষ্কারের মাধ্যমে সেগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন। ইউরোপীয় ও ইহুদি পণ্ডিতদের মধ্যেও আরবি ভাষা শেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, যাতে তারা এসব জ্ঞানকর্মের নাগাল পেতে পারেন।
মাহাথিরের বক্তব্যের মূল শিক্ষা হলো, মুসলিম সভ্যতার উন্নতির পেছনে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, অনুবাদ এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বড় ভূমিকা ছিল। তাই মুসলমানদের আবারও জ্ঞান সৃষ্টি ও গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে গর্ব করলেই বর্তমানের দুর্বলতা দূর হবে না।
মুসলমানদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণার সমালোচনা
১৯৯৯ সালের ২৫ মে কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং আয়োজিত আন্তধর্মীয় বোঝাপড়াবিষয়ক এক সেমিনারে মুসলিমদের সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন মাহাথির।
তিনি বলেন, মুসলমানদের অনেক সময় পশ্চাৎপদ, উগ্র, অসামাজিক, অযৌক্তিক কিংবা সন্ত্রাসপ্রবণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ অল্প কিছু মানুষের অপরাধের দায় পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো মুসলমানদের মধ্যেও জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের বৈচিত্র্য রয়েছে। তাই সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্য ধর্মাবলম্বীদের কেউ অপরাধ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সাধারণত সেই অপরাধের দায় পুরো ধর্মের ওপর চাপানো হয় না। কিন্তু কোনো মুসলিম অপরাধ করলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে ইসলাম ও মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এ ধরনের দ্বৈত আচরণ মুসলমানদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়।
মাহাথিরের মতে, ইসলামি ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সহযোগিতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। মুসলিম সমাজকে সেই ঐতিহ্য আবারও সামনে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও মুসলমানদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যাচাই করে দেখার এবং বিচ্ছিন্ন অপরাধের দায় পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর না চাপানোর মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ইসলামি সভ্যতায় ধর্মীয় সহাবস্থানের ঐতিহ্য
মাহাথির ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসকে শুধু মুসলমানদের রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক সাফল্যের বিবরণ হিসেবে দেখেননি। বরং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও এর ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরেছেন।
১৯৯৯ সালের এক বক্তব্যে তিনি বলেন, অতীতের ইসলামি সভ্যতায় বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ জ্ঞানচর্চা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। অথচ আধুনিক বিশ্বে অনেক সময় মুসলমানদের অন্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দূরত্ব কমাতে ইসলামি সভ্যতার সহনশীলতা ও সহযোগিতার ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মালয়েশিয়ার বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজের অভিজ্ঞতাও তিনি বিভিন্ন বক্তব্যে তুলে ধরেছেন। তার মতে, মালয়েশিয়ায় ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।
তার দৃষ্টিতে, ইসলামি পরিচয় বজায় রেখেও বহুধর্মীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা কিংবা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করা উচিত নয়।
মুসলিম উম্মাহর আত্মসমালোচনা ও নতুন করে জেগে ওঠার আহ্বান
২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য উম্মাহ: রি-এক্সামিনিং অ্যান্ড রিইনভেন্টিং আওয়ারসেলভস ইন দ্য ফেস অব নিউ চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন মাহাথির মোহাম্মদ। সেখানে মুসলিম উম্মাহর বর্তমান সংকট, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং মুসলমানদের চিন্তাগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামকে নতুন করে পর্যালোচনা করার আগে এর মৌলিক শিক্ষা এবং মহানবী (সা.)-এর প্রচারিত মূল বার্তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করা জরুরি। ইসলামের মৌলিক বিষয় পরিবর্তনযোগ্য নয়। তবে সময়ের ব্যবধানে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে কোনো বিচ্যুতি তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
মাহাথির প্রশ্ন তোলেন, যে ইসলাম একসময় বিভক্ত ও সংঘাতপূর্ণ আরব গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে তুলেছিল, সেই ধর্মের অনুসারীরা আজ কেন বিভক্ত, দুর্বল ও অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে?
মুসলিম সমাজের সাম্প্রদায়িক বিভাজন, পারস্পরিক বিরোধ এবং ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, ধর্মীয় শিক্ষাকে ক্ষমতা অর্জনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হলে মুসলিম সমাজের ঐক্য ও উন্নয়ন ব্যাহত হয়।
তিনি মনে করেন, মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি শিক্ষা, চিন্তাভাবনা, জ্ঞানচর্চা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। নিজেদের ব্যর্থতা চিহ্নিত না করে সব সমস্যার জন্য বাইরের শক্তিকে দায়ী করলে প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে
ইসলামের নামে উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে মাহাথির মোহাম্মদ বিভিন্ন সময়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ২০০০ সালের ৩ অক্টোবর লন্ডনে মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের এক সভায় ‘দ্য ফিউচার অব মুসলিমস ইন দ্য নিউ সেঞ্চুরি’ শীর্ষক বক্তব্যে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মুসলিম উম্মাহর উন্নয়নে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না। বরং এর ফলে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা, অবিশ্বাস ও বৈরিতা আরও বৃদ্ধি পায়।
তার মতে, নিরপরাধ মানুষ হত্যা কিংবা অমুসলিমদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়ে ইসলামকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ধর্মের নামে এ ধরনের সহিংসতা মুসলিম দেশগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে এবং মুসলিম সভ্যতার অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুর সামিটের উদ্বোধনী বক্তব্যেও একই বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। মাহাথির বলেন, কিছু মুসলমানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ইসলাম ও মুসলমানদের সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যারা নিজেদের জিহাদের নামে নির্বিচার সহিংসতায় জড়াচ্ছে, তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য বিপদ বাড়াচ্ছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা কিংবা অসন্তোষ থাকলেও তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিরপরাধ মানুষ হত্যা করা গ্রহণযোগ্য নয়। সহিংসতার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; বরং এতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় মুসলমানদেরও দায়িত্ব রয়েছে
২০১৯ সালের কুয়ালালামপুর সামিটে মাহাথির ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তার মতে, ইসলাম ও মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদ, অসহিষ্ণুতা এবং অযৌক্তিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা বিশ্বে বেড়েছে। মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট কিংবা কিছু ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো ধর্ম ও জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা হচ্ছে।
তবে ইসলামবিদ্বেষের জন্য শুধু বাইরের বিশ্বকে দায়ী করেই থেমে থাকেননি তিনি। মুসলমানদের নিজেদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, মুসলিম পরিচয়ে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভয় ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ধর্মের নামে সংঘটিত সহিংসতা ও অন্যায় বন্ধ করাও জরুরি।
তার বক্তব্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, মুসলিম পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ধরনের সন্ত্রাস, অন্যায় কিংবা নিরপরাধ মানুষের ওপর আক্রমণকে সমর্থন করা যাবে না।
মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা মাহাথিরের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে। তার মতে, মুসলিম দেশগুলোর হাতে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনশক্তি এবং বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভক্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতার কারণে এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি বিনিময়, গবেষণা, শিল্পায়ন ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ইসলামি ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিয়েও তার বক্তব্য রয়েছে। তার মতে, ইসলামের ব্যবসায়িক নির্দেশনায় সততা, স্বচ্ছতা এবং প্রতারণা পরিহারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মুসলিম ব্যবসায়ীরা এসব নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারলে নিজেদের অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।
ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসির কার্যকারিতা নিয়েও মাহাথির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় সংস্থাটি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
২০২৪ সালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওআইসির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বসম্মতির বাধ্যবাধকতা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা চালুর পক্ষে মত দেন তিনি।
একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সম্পদ ও জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেগুলোর সমন্বিত ব্যবহার দেখা যায় না। এ অবস্থার পরিবর্তনে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনের অধিকার ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা
মুসলিম বিশ্বের সংকট নিয়ে মাহাথিরের আলোচনায় ফিলিস্তিন ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং এ বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি।
মাহাথিরের মতে, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং নিপীড়ন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার আধুনিক সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ। কিন্তু গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর নীতির সঙ্গে তাদের ঘোষিত মানবিক মূল্যবোধের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, কয়েকটি দেশের হাতে থাকা বিশেষ ক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় ওআইসির সংস্কার এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত অবস্থান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে নিজের শততম জন্মদিন উপলক্ষে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন মাহাথির। তার বক্তব্যে গাজা সংকটকে শুধু মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমস্যা হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক চিন্তা নিয়ে গবেষকদের মূল্যায়ন
মাহাথির মোহাম্মদের ইসলামবিষয়ক বক্তব্য ও চিন্তাধারা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাও পরিচালিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সভেন আলেকজান্ডার শটম্যান ২০১৩ সালে ‘ইসলাম অ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ান-মুসলিম রিলেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘গড হেল্পস দোজ হু হেল্প দেমসেলভস: ইসলাম অ্যাকর্ডিং টু মাহাথির মোহাম্মদ’ শীর্ষক গবেষণায় তার ধর্মীয় চিন্তাভাবনা বিশ্লেষণ করেন।
গবেষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক চিন্তায় উন্নয়ন, আত্মনির্ভরশীলতা, সহনশীলতা, বহুত্ববাদ এবং দৈনন্দিন জীবনে ধর্মীয় নৈতিকতা অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তার বক্তব্যে ইসলামকে এমন একটি জীবনদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষকে কর্মমুখী, দায়িত্বশীল ও উন্নয়নপ্রত্যাশী হতে উৎসাহিত করে।
তবে গবেষক মাহাথিরের বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামপন্থি বিরোধী শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বহুজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে দেশের পরিচয় বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তার ধর্মীয় অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক বক্তব্যকে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সামাজিক কাঠামোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব নিয়ে মাহাথিরের বক্তব্যের মূল শিক্ষা
ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে মাহাথির মোহাম্মদের দীর্ঘদিনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার দৃষ্টিতে ইসলাম শান্তি, মধ্যপন্থা, নৈতিকতা, জ্ঞানার্জন ও মানবকল্যাণের ধর্ম। মুসলিম সমাজের বর্তমান দুর্বলতার জন্য ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দায়ী নয়; বরং শিক্ষা, গবেষণা, ঐক্য, নেতৃত্ব, প্রশাসন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের যথাযথ প্রয়োগে ব্যর্থতাই বড় কারণ।
তিনি ইসলামকে আধুনিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখেননি। বরং ধর্মীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য বজায় রেখেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসলামি সভ্যতার ঐতিহাসিক অর্জন স্মরণ করার পাশাপাশি মুসলমানদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও ইসলামবিদ্বেষের সমালোচনা করার পাশাপাশি ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বারবার বলেছেন।
মাহাথিরের বক্তব্য থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে গর্ব করলেই মুসলিম বিশ্বের পুনর্জাগরণ ঘটবে না। বরং অতীতে মুসলিম সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছিল যে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, কর্মনিষ্ঠা, নৈতিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা, সেগুলো নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ইসলামকে আধুনিকতার বাধা হিসেবে নয়, বরং নৈতিকতা ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের প্রেরণা হিসেবে কাজে লাগানোই হতে পারে মুসলিম সমাজের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম পথ।



