
বাংলা টিভি ডেস্ক: প্রাধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ায় মামলার পর কারাগারে পাঠানো হয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অব্যাহতিপ্রাপ্ত যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। কারাগারে তাকে অপরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসহীন সেলে রাখা হয় এবং রিমান্ডে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ তুলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে- নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে। এরপরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না, সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রে ও সরকারের মধ্যে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জেলে গিয়ে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও আমি এসব জাতির সামনে তুলে ধরতে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।
এরপর অসুস্থতার কারণে কথা বলতে না পারায় তানভীরের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।
লিখিত বক্তব্য তানভীর বলেন, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, অথচ ৫ আগস্ট বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিনে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান এই মামলার বাদী। ৫ আগস্ট আমাকে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেওয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাসহীন। বিদ্যুৎও নেই, একটা ফ্যানও নেই। কারারক্ষীরাও আওয়ামী লীগের। তাদের বেশিরভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এবং তারা আমাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করত, আশপাশের কয়েদিরাও আওয়ামী লীগের আসামি। তারাও যা-তা বলে সম্বোধন করত।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেওয়া হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেওয়া হলো, কিন্তু আমাকে দুইদিনের পচা খাবার দেওয়া হলো। কারাগারে এমন পচা-বাসি খাবারদাবার দেওয়া হতো, খাওয়ার অযোগ্য। একপর্যায়ে আমার ডায়রিয়া হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। সেখানে যে ওষুধ লিখেছেন ডাক্তার সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি, অজানা ওষুধ আমাকে খেতে হয়েছে।
শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে- এমন অভিযোগ করে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, এসব কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। অন্তত ৭০/৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত। একদিন হাত-পা কাঁপছিল, ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিলেন এবং আমার ডান হাত আর ডান পা অবশ হয়ে গেল, বাধ্য হয়ে শহীদ জিয়া মেডিকেলে নিয়ে গেল। ডাক্তার সেখানে বলেছেন, আমার স্ট্রোক হয়েছে কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বললো না স্ট্রোক করেনি, কিছুই হয়নি।
তিনি বলেন, আমার সিটি স্ক্যান করানো হলো, রিপোর্ট কী আসল জানি না, কারা কর্তৃপক্ষ বললো কোনো সমস্যা নাই, সব ঠিক আছে। পরে বললো এমআরআই করাতে হবে, শহীদ জিয়া মেডিকেলের এমআরআই মেশিনটা নষ্ট, তারপরও সেখানে আমাকে ঢুকালো। আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে গেল। আমি ১০/১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। পরে দেখি শহীদ জিয়া মেডিকেলের প্রিজন সেলে এবং আমার শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা। একজন কোনোরকমে পরিষ্কার করে দিল।
‘পরে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ঢাকায় আনা হলো। কেরানীগঞ্জে যেখানে রাখা হলো ওটাও খুবই খারাপ সেল। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হলো, এদিক সেদিক ঘুরায় শুধু। এখানে ডাক্তার দেখিয়ে জেলে নেওয়ার সময় গাড়িতে হঠাৎ সাদা পোশাকে কয়েকজন লোক উঠে আসে, তারা আমাকে টর্চার করে।’
‘টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ এবং সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো- জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে। ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, ফোনে কথা বলে ভালো খাবারদাবার খায়, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আমার ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে, বর্তমানে আমার প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগে ও প্যাডে করতে হচ্ছে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছি, আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে, জানি না চিকিৎসার কী হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি। আপনাদের কাছে দোয়া চাই এবং দোয়া করি, আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে আর কারও সঙ্গে যেন করা না হয়।



