দেশবাংলা

স্বীকৃতি পেতে আজও যুদ্ধ করছেন গুলিবিদ্ধ মনমোহিনী

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের হাড়গ্রামে হরকুমার ও প্রফুল্ল রানীকে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। সেই স্মৃতিকে স্বরণ করে আজও বেঁচে আছেন সেই বাবা, মা হারানো গুলিবৃদ্ধ ৬৫ বছরের মেয়ে মনমোহিনী বিশ্বাস।

স্থানীয়রা জানায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকার রাজাকার মৌলানা ফজুল হক, ইসকন্দর মিয়া, আব্দুল রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানী বাহিনী হামলা চালায়। ১৯৭১ সালের ভয়াল সেই রাতে মনমোহিনীর বাবা হরকুমার ও মা প্রফুল্ল রানীকে গুলি করে হত্যা করে। সে সময় মনমোহিনী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন।

মৌলানা ফজুলহক তাদের বাড়ি দখল করে নিয়েছেন মনমোহিনী ও তাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। এখন মনমোহিনীর থাকার কোনো জায়গা নেই। থাকেন অন্যর বাড়িতে। একটি বাড়ির জন্য সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। রাজাকাদের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ আদালতে মামলা ও করেছিলেন মনমোহিনী। পাননি কোন সুফল।

এদিকে, ৫০ বছরেও তার নাম মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা কিংবা সহায়তার তালিকায় উঠেনি। স্বীকৃতির জন্য ঘুরেও কোন সুফল না মেলায় তিনি হতাশ।

সরেজরিনে দেখা যায়, মনমোহিনী বয়সের ভারে অনেকটাই নুইয়ে পড়েছেন। ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আদায়ে এক অফিস থেকে অন্য অফিসে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছেন। তবুও মিলছে না সাফল্য, পাচ্ছেন না মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। ইতিমধ্য ছয়বার গিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকার করার চেষ্টাও করেছেন তিনি।

এ ব্যাপারে তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে গেছেন অনেকে। কিন্তু বুক ফেটে এখন কান্না আসে যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান-স্বীকৃতি পাচ্ছেন অনেকে। অথচ আমি গুলি খেয়েও এ সম্মান থেকে বঞ্চিত।

জগন্নাথপুর সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডর আব্দুল কায়ুম বলেন মনমোহিন অনেকবার ঢাকায় গিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা মন্তনালয়ে আবেদন করেছেন। ২০১১ সালে মনমোহিনী রানী বিশ্বাস হাড় গ্রামের রাজাকারের মৌল্লানা ফজুল হক সহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। ২০১৪ সালে গেজেটেড হওয়ার জন্য আবেদনও করেছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ফাইলেই আটকে রয়েছে, কোনো অগ্রগতি হয়নি।

গুলিবিদ্ধ মনমোহিনীর ছেলে গোপাল সরকার বলেন আমার দাদা দাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। আমার মাও গুলিবিদ্ধ হন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছে আমার মার একটাই আবেদন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি। স্বীকৃতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান।

উপজেলা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক বলেন, মনমোহিনী একজন গুলি বৃদ্ধ রানী,পাকিস্তান বাহিনীর হাতে তার বাবা মাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আর এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সকলেই জানেন। ১৯৭১ সালে বীরত্বের স্বাধীনতার বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে আজও তিনি যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। জীবদ্দশায় তিনি একজন বীরাঙ্গনা হিসেবে যথাযোগ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পাবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।

এ বিষয়ে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান জানান, মুক্তিযোদ্ধা বীরঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মানী বা এই সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে সর্বোপরি এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয় এ আবেদন যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেবে।

গোবিন্দ দেব, জগন্নাথপুর প্রতিনিধি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button