দেশবাংলা

নোয়াখালীতে পাকসেনাদের ঘাঁটিতে নির্মাণ হচ্ছে ৭১ যাদুঘর

||ইয়াকুব নবী ইমন, নোয়াখালী||

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌরাস্তা সরকারী কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালে পাকসেনা ও রাজাকারদের ঘাঁটিতে নির্মাণ করা হচ্ছে ৭১ স্মৃতি যাদুঘর। যাদুঘরটি নির্মিত হলে মুক্তিযুদ্ধোর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে এখানকার নতুন প্রজম্ম।

জেলা পরিষদের এই উদ্যেগকে সাধুবাদ জানিয়ে দ্রুত যাদুঘরটি জনসাধানের জন্য উম্মুক্ত করার দাবী জানিয়েছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতন মহল।

ইতিহাস মতে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশ যখন উত্তাল। বিভিন্ন স্থানে ঘটছে পাক বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে চলছে সমর যুদ্ধ। ৭১ এর ৭ ডিসেম্বরের আগেই নোয়াখালীর অধিকাংশ এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চলে আসে। একের পর ঘাঁটি পতন হওয়ায় চৌরাস্তার সরকারী কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের পশ্চিমাংশের দুটি কক্ষ দখল করে পাক সেনা ও রাজাকাররা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলে। তারা বৃহত্তর নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিকামী বাঙ্গালী ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এই ঘাঁটিতে নির্মম নির্যাতন চালাতো।

ধর্ষণের পর হত্যা করা হতো বাঙ্গালী নারীদের। মানুষরূপি হয়নারা মৃত দেহগুলো ফেলো দিতে পাশ্ববর্তী কালা পোল এলাকার প্রবাহমান খালসহ আশপাশের ডোবা নালায়। ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের তোপের মুখে নোয়াখালীর এই ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যায় অবৈধ দখলদার পাব সেনা ও রাজাকাররা। কিন্তু রেখে যায় তাদের নি:শংসতার চিহৃ। এর পর থেকে এই দুটি কক্ষ স্কুল কর্তৃপক্ষ আর ব্যবহার করেনি। এটি পড়েছিলো পরিত্যাক্ত অবস্থায়। এক পর্যায়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার আর তাদের এদেশীয় দোসরদের এমন নারকীয় তান্ডবে নিহতদের ম্মরণে একটি যাদুঘর নির্মানের জন্য দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন মহলে দাবী জানিয়ে আসছিলো।

অবশেষে জেলা পরিষদ পাকসেনাদের এই ঘাঁটিকে মুক্তিযুদ্ধের যাদু ঘর নির্মাণের উদ্যেগ নেয়। নাম দেওয়া হয় ৭১ যাদুঘর। যাদুঘরটি পরিপূর্ন ভাবে নির্মিত হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে নতুন প্রজম্ম। বিষয়টি জেনে উচ্ছ্বাসিত তারা। তবে যাদুঘরটি রক্ষনাবেক্ষনের জন্য একজন কর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও তাকে এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে অনেকটা অগোচালোই রয়েছে যাদুঘরটি। যাদুঘরটির  সম্মুখে ও অভ্যন্তরে নির্মাণ করা হয়েছে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীর ৭ বীর শ্রেষ্ঠর প্রতিকৃতি। তুলে ধরা হয়েছে যুক্তিযুদ্ধে সময় মুক্তিকামী বাঙ্গারী ও সাধারণ জনগনের উপর পাক সেনা ও রাজাকারদের নির্মমতার চিহৃ।

সরকারী কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয় ও জালাল উদ্দিন কলেজের একাধিক শিক্ষাথী জানায়, যাদুঘরটি নির্মিত হলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে সঠিক ইতিহাস জানতে পারবো। দ্রুত যাদুঘরটি উম্মক্ত করার দাবী জানায় তারা।

জেলা পরিষদের এই উদ্যেগকে সাধুবাদ জানিয়ে দ্রুত যাদুঘরটি জনসাধানের জন্য উম্মুক্ত করার দাবী জানিয়েছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল হোসেন বাঙ্গারী জানান, মুক্তিযুদ্ধা ও সাধারণ মানুষের উপর পাক বাহিনীর নির্যাতনের এই সার্টারসেলটি সংরক্ষণ করে এখানে একুটি যাদুঘর নির্মানের দাবী ছিলো আমাদের দীর্ঘদিনের। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, যাদুঘরটি নির্মাণের উদ্যেগ নিলেও তা এখনো পুরোপুরি সম্পর্ন হয়নি। তাই যাদুঘরটিতে একটি লাইব্রেরি নির্মাণসহ আনুষাঙ্গীক কাজ সম্পর্ন করতে তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সকলের প্রতি আহবান জানান।

 বেগমগঞ্জ সরকারী কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানান, স্কুলের এই দুটি কক্ষে পাকিস্থানীরা ঘাঁটি করে এলাকার মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন করতো। নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ কালাপোলসহ বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিতো। স্বাধীনতার পর এই কক্ষ দুটি আমরা আর ব্যবহার করিনি। এখন জেলা পরিষদ যাদুঘর করার উদ্যেগ নেয়ায় আমরা সাধুবাদ জানাই। এই যাদুঘরের মাধ্যমে আমাদের ছেলে-মেয়েরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারবে। স্মরন করতে আমাদের প্রতি পাকিস্তানীদের নির্যাতনের চিত্র।

 নোয়াখালী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা: এবিএম জাফর উল্যাহ বলেন, নতুন প্রজম্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরাই এই যাদুঘর নির্মাণের উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাত, ঐতিহ্য, যুদ্ধের কাহিনী সংরক্ষণ করতে সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়সহ বিভিন্ন কাজ করছে। আমরা সহসায় চৌরাস্তার যাদুঘরটি জনগনের জন্য উম্মুক্ত করে দেব।

এ ব্যাপারে নোয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ, শুধু মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নয়, সরকারী উদ্যেগের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গণকবর ও বধ্যভূমি সংরক্ষনেও আমরা ব্যবস্থা নেব। না হয় নতুন প্রজম্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হবে।

এমতাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজম্মের কাছে তুলে ধরতে সকল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে চৌরাস্তায় নির্মিত ৭১ যাদুঘরটি দ্রুত সবার জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়া হবে এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন মহলের।

 বাংলাটিভি/এবি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button
Close