দেশবাংলা

মৃত্যুর একযুগ পর বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেলেন গুরুদাসী মন্ডল

অবশেষে মৃত্যুর দীর্ঘ একযুগ পর বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি মিলেছে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বামী-সন্তান হারানো খুলনার কপিলমুনির ‘গুরুদাসী মাসি’ নামে পরিচিত গুরুদাসী মণ্ডলের। মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে গুরুদাসী মণ্ডলসহ ৬১ জন নারীকে এ স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ গণমাধ্যমকে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ ও বীরাঙ্গনাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের যথাযথ স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে চায়। গত ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবসের অনুষ্ঠানে বীরাঙ্গনা গুরুদাসির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী গুরুদাসীসহ ৬১ জন নারীকে বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ হয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটিয়া ইউনিয়নের ফুলবাড়ী গ্রামের গুরুপদ মন্ডল পেশায় দর্জি ছিলেন। ২ ছেলে ২ মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ছিল তার সংসার। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সাধ্যমতো সব রকম সাহায্য-সহযোগিতা করতেন তিনি। রাজাকারদের ইন্ধনে পাক বাহিনী তার বাড়িতে হামলা চালায়। একে একে পরিবারের সব সদস্যকে বাড়ির উঠানে জড়ো করা হয়।

তার স্ত্রী গুরুদাসী মন্ডলের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পাক সেনাদের। নিজ স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে এগিয়ে এলে গুরুদাসীর সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয় তার স্বামী, ২ ছেলে ও ১ মেয়েকে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মৃতদেহ বীভৎস করে দেয়া হয়। এরপর গুরুদাসীর কোলে থাকা দুধের শিশুকে মাতৃক্রোড় থেকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের সামনেই তাকে পুঁতে ফেলা হয় বাড়ির পাঁশে কাদা পানির ভেতরে। তারপর গুরুদাসীর ওপর হায়েনারা পাশবিক নির্যাতন শুরু করে।

পাক হানাদাররা চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী গুরুদাসীকে উদ্ধার করে। নিজ চোখের সামনে স্বামী, ছেলেমেয়ের মৃত্যু এবং পাক সেনাদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়ে গুরুদাসী ততক্ষণে পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মুক্তিযোদ্ধারা গুরুদাসীকে উদ্ধার করে তাদের হেফাজাতে রাখেন। দেশ স্বাধীনের পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে এক সময় ফিরে আসেন স্বামী-সন্তানের স্মৃতি বিজড়িত খুলনার পাইকগাছায়। মানসিক ভারসাম্যহীন গুরুদাসী ভিক্ষা করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান। হাতে ছোট্ট লাঠি, মানুষকে হাসতে হাসতে ভয় দেখানো আর হাত পেতে ২ টাকা চেয়ে নেয়া-এভাবেই গুরুদাসীর দিন কাটতে থাকে। গুরুদাসী হয়ে ওঠেন এলাকার সবার কাছের মানুষ, পরিচিত মুখ।

পরে বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রসাশক মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামরুজ্জামান টুকু, পাইকগাছা উপজেলার চেয়ারম্যান স ম বাবর আলী ও ততকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা মিহির কান্তি মজুমদার কপিলমুনিতে সরকারি জায়গায় গুরুদাসীর বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে দেন। সেখানেই অনাদরে, অযত্নে, অভাবে দীর্ঘদিন পড়ে থাকেন তিনি। ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।

পরের দিন নিজের শয়নকক্ষে তার মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখে পার্শ্ববর্তী লোকজন। গুরুদাসীর মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে আসেন মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষ। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুদাসীর আত্মত্যাগের কথা আজও ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি। পাইকগাছা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডঃ স.ম. বাবর আলী বলেন, গুরুদাসী মাসীকে মরণোত্তর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির দাবি ছিল তাদের। এটি পুরণ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তবে, তার শেষ স্মৃতিবিজড়িত বাড়ীটি রাষ্টীয়ভাবে সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১৬সালে ১২অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক গেজেটে ৪১ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে প্রথম গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ওই সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ কম মোজাম্নেল হক জানান, মুক্তিযুদ্ধে দেশের স্বার্থে বীরাঙ্গনারা অনেক বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাদের অবদান কখনোই ভোলা যাবে না। এ জন্য সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button