৩৪ বছর ধরে নিজ উদ্যোগে গাছ লাগিয়ে গ্রামের চিত্র বদলে দিলেন ইমাম

বাংলা টিভি ডেস্ক: মানুষের চিন্তা, স্বপ্ন ও কাজের ধরন একেকজনের একেক রকম। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের উদ্যোগও তেমনই ব্যতিক্রমী। পেশায় তিনি মসজিদের ইমাম। তবে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় তিন দশক ধরে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন নিজের উদ্যোগে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মল পরিবেশ তৈরি এবং সদকায়ে জারিয়ার উদ্দেশ্যে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তুলেছেন তিনি। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন ফলদ, ঔষধি ও বনজ গাছের চারা লাগিয়েছেন সরকারি সড়কের দুই পাশে।
তার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় ওমরপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের সড়ক এখন সারি সারি তালগাছে ঘেরা। বদলে গেছে পুরো এলাকার দৃশ্যপট। গাছের ছায়া ও সবুজে পথচারীদের যেমন স্বস্তি মিলছে, তেমনি আকৃষ্ট হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষও।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৬০ বছর বয়সি রেজাউল কিবরিয়া বাবুল ওমরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি জনতা বাজারসংলগ্ন কালাপানিয়া বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় দুই যুগ ধরে ওই মসজিদে ইমামতি করছেন তিনি। তার পরিবারে স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে।
১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করেন বাবুল। এ জন্য প্রায় ৮ লাখ টাকায় পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে স্থানীয় ভূইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি স্থাপন করেন। পরে মাইকিং করে স্থানীয়দের বিভিন্ন ধরনের গাছের চারা বিতরণ এবং বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করেন।
দীর্ঘ ৩৪ বছরে তিনি বিভিন্ন সড়কের পাশে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছেন বলে জানান। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ হাজার। সব গাছ টিকে না থাকলেও তিনি এখনো নতুন করে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ওমরপুরের বাউল সড়কের পাশাপাশি আরও চারটি সড়কের দুই পাশেও তার বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তালগাছের পাশাপাশি বাবুল বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও ঔষধি গাছও লাগিয়েছেন। বছরের পর বছর যত্ন নেওয়ায় এসব গাছ এখন বড় হয়ে রাস্তার দুই পাশে সবুজ ছায়া তৈরি করেছে। এতে পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, তালগাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
গাছগুলো শুধু পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে না, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তালপাতা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়, আবার তালগাছ থেকে জ্বালানিও সংগ্রহ করা যায়। গাছের ফলও স্থানীয়দের বাড়তি আনন্দের কারণ হয়ে উঠেছে।
সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছের কারণে জায়গাটি এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই গাছের ছায়ায় বসে সময় কাটান, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন। কেউ কেউ আবার এই মনোরম পরিবেশের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিয়ে যান।
রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষরোপণ করছেন। ১৯৯৩-৯৪ সালে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি স্থাপনের মধ্য দিয়ে কাজটি শুরু করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন এলাকায় গাছ লাগানো ও মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করে আসছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে নিজের নার্সারিতে নিয়মিত চারা উৎপাদনের সুযোগ না থাকায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করেন। বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালগাছের বীজ ও চারা রোপণের ওপরও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি মাঝে মাঝে বন বিভাগের পরামর্শ নেন।
বাবুলের ভাষ্য, গাছ লাগানোকে তিনি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখেন। তার লক্ষ্য গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ঢেকে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর ও বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা। যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন এই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ফল ও ফুলের বাগান তৈরি করে অবসর সময় কাজে লাগানো সম্ভব। এর মাধ্যমে নানা ধরনের খারাপ অভ্যাস থেকেও দূরে থাকা যায়। নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে সবাইকে বেশি করে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাবুলের লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়েছে এবং ফলও দিচ্ছে। তাদের ভাষায়, বাউল গ্রামের সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ দেখে মনে হয় যেন কোনো ফটকের ভেতর দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গাছের কারণে এলাকার সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান এবং দূরের মানুষও দৃশ্যটি দেখতে আসেন।
বাবুলের উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয়দের অনেকেই নিজেদের জমিতে আরও বেশি গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তারা।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজও এই ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তিনি জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রায় তিন যুগ ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলা রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের এই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম স্থানীয়দের কাছে পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তার লাগানো গাছগুলো যেমন এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি করছে সবুজ ও ছায়াঘেরা একটি পরিবেশ।



