বাংলাদেশ

ষাটগম্বুজ মসজিদে বাড়ছে টিকটকারদের উৎপাত, স্থানীয়দের উদ্বেগ

বাংলা টিভি ডেস্ক: বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ। শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী এবং ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে দেশের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। হজরত খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শনার্থী।

তবে বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্থাপনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও ছবি তৈরির নামে কিছু দর্শনার্থীর আচরণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন ব্যক্তিদের অভিযোগ, মসজিদের ভেতরে এবং দেয়ালসংলগ্ন এলাকায় কেউ কেউ টিকটক, রিলসসহ বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ধারণ করছেন। এ সময় অশোভন অঙ্গভঙ্গি, উচ্চস্বরে কথা বলা এবং ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন আচরণের ঘটনাও ঘটছে বলে তাদের অভিযোগ।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেতে দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানে ছবি-ভিডিও ধারণ অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব কর্মকাণ্ডের সময় স্থাপনার মর্যাদা ও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সচেতন নাগরিকরা।

গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আসরের নামাজের পর ষাটগম্বুজ মসজিদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দেশি-বিদেশি অনেক দর্শনার্থী স্থাপনাটি ঘুরে দেখছেন। মসজিদের প্রধান ফটকের পাশে থাকা বড় দুটি মেহগনি গাছের কাছে দুই দর্শনার্থীকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়।

তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এ ধরনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশি ভিউ পাওয়া যায়। তবে ধর্মীয় স্থাপনায় এমন ভিডিও তৈরির কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে চলে যান।

কিছুটা এগিয়ে মসজিদের পশ্চিম পাশের দেয়ালের কাছে দুই তরুণীকে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলতে দেখা যায়। মসজিদের দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে ছবি তোলার কারণ জানতে চাইলে তারা এটিকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে মন্তব্য করেন। পরে মসজিদের পবিত্রতা ও স্থাপনার মর্যাদা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলেও তারা কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান।

খুলনা থেকে পরিবার নিয়ে ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে আসা দর্শনার্থী রাইয়ান ইসলাম বলেন, ষাটগম্বুজ মসজিদ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এখানে দেশ-বিদেশের মানুষ ঘুরতে আসেন। কিন্তু এমন একটি ঐতিহাসিক স্থানে এসে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা মোটেও প্রত্যাশিত নয়।

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ষাটগম্বুজ মসজিদকে একক স্থাপনা হিসেবে নয়, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীর অংশ হিসেবে ১৯৮৫ সালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বাগেরহাটের এই ঐতিহাসিক নগরী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

ইতিহাস অনুযায়ী, এলাকাটি একসময় ‘খলিফাতাবাদ’ নামে পরিচিত ছিল। ১৫ শতকে উলুঘ খান জাহান বা খানজাহানের উদ্যোগে এখানে একটি সমৃদ্ধ মুসলিম নগর গড়ে ওঠে। মসজিদ, সমাধি, রাস্তা, সেতু ও জলাধারসহ বিভিন্ন স্থাপনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সেই নগরীর অন্যতম প্রধান নিদর্শন ষাটগম্বুজ মসজিদ।

নাম ষাটগম্বুজ হলেও মসজিদের মূল ছাদে রয়েছে ৭৭টি গম্বুজ। চার কোণের চারটি গম্বুজসহ মোট গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। মসজিদের অভ্যন্তরে রয়েছে ৬০টি স্তম্ভ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও মসজিদের ভেতরে বা দেয়ালের আশপাশে এমন আচরণের অভিযোগ ওঠা উদ্বেগজনক। তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে নজরদারি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে বিশাল একটি দিঘি, যা ঘোড়াদিঘি নামে পরিচিত। দিঘির পাড়ে ইটের তৈরি নান্দনিক পথের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বসার জন্য রয়েছে ছাউনিযুক্ত স্থান। সংরক্ষিত এলাকার বাইরে বিভিন্ন খাবার, পান ও সিগারেটের দোকান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ এসব দোকান থেকে সিগারেট কিনে সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে বসেই ধূমপান করেন।

ষাটগম্বুজ মসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাস্টডিয়ান মোহাম্মদ যায়েদ বলেন, অনেক সময় দর্শনার্থীরা কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে টিকটক, রিলস ও ছবি ধারণ করেন। অশোভন আচরণের বিষয়টি নজরে এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে এবং ভবিষ্যতে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।

ষাটগম্বুজ বায়তুশ শরীফ আদর্শ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ আসলাম হোসেন বলেন, ষাটগম্বুজ মসজিদ বাগেরহাটের গৌরব এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। এখানে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড ঘটলে স্থাপনাটির ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি অশালীন আচরণও উৎসাহিত হতে পারে।

তিনি বলেন, স্থাপনাটির পবিত্রতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রক্ষায় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button