‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকবো’ এক রাতে ডেঙ্গুতে মারা গেলেন দুই অন্তঃসত্ত্বা

বাংলা টিভি ডেস্ক: খুলনা নগরের সিদ্দিকীয়া মহল্লার কাছে নাহিদ হাসানদের পারিবারিক বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলছে নাহিদ হাসান ও নুসরাত জাহান দম্পতির দুই সন্তান—বড় ছেলে রাইয়ান হাসান ও ছয় বছরের রওদা হাসান।
মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি কিছুটা বুঝতে পারছে রাইয়ান। তবে ছয় বছরের রওদার কাছে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। সে বুঝতে পারছে না, কেন তার মা আর ঘরে ফিরছেন না। তাই মাঝেমধ্যেই স্বজনদের কাছে জানতে চাইছে, ‘আমি কাকে আম্মু বলে ডাকব?’
শিশুটির এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা।
নাহিদের বড় ভাই মাহমুদ হাসান সোহেল জানান, তাদের পরিবারে সুখের পরিবেশ ছিল। তৃতীয় সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় সবাই আনন্দিত ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে ছোট মেয়েটির জন্য। মায়ের কথা জানতে চেয়ে সে বারবার প্রশ্ন করছে বলে জানান তিনি।
নাহিদ ও নুসরাতের তৃতীয় সন্তানের জন্মের তারিখও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ২০ সেপ্টেম্বর নুসরাতের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের কথা ছিল। অনাগত সন্তানের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন তারা। নতুন অতিথিকে ঘিরে পরিবারে চলছিল নানা প্রস্তুতি।
কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বর নুসরাতের ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তার রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে ৬২ হাজারে নেমে আসে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউ প্রয়োজন হয়। একাধিক হাসপাতালে চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত নুসরাতকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে রওনা হন তার স্বামী নাহিদ। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভাঙ্গার কাছে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি বটিয়াঘাটার ইউসুফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গর্ভধারণের পর চাকরি ছেড়ে দেন এবং সন্তানদের দেখাশোনাতেই সময় কাটাচ্ছিলেন। এর মধ্যে ১৫ সেপ্টেম্বর বড় ছেলে রাইয়ানের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মশার কামড় থেকে রক্ষা করতে নুসরাত নিজেই সবসময় সতর্ক থাকতেন।
নাহিদ হাসান খুলনার গ্রামীণফোন সেন্টারে ডেপুটি ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারানোর পর এখন দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি। পুরো ঘটনায় কীভাবে সবকিছু এমনভাবে বদলে গেল, তা বুঝে উঠতে পারছেন না বলে জানান নাহিদ।
মাকে খুঁজছে দেড় বছরের কেয়া
খুলনার আরেকটি পরিবারেও একই ধরনের শোক নেমে এসেছে। তবে সেখানে মাকে হারানোর বিষয়টি বোঝার মতো বয়স হয়নি দেড় বছরের শিশু কেয়ার।
খুলনা নগরের বসুপাড়ায় সাদিয়া আফরিন সুমাইয়ার বাবার বাড়ি। দ্বিতীয়বার মা হওয়ার অপেক্ষায় সেখানেই ছিলেন তিনি। তার স্বামী শেখ ইশতিয়াজ সম্রাট পেশায় আইনজীবী। তাদের দেড় বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যার নাম কেয়া।
কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন সুমাইয়া। একই সময়ে তার মা-বাবাও অসুস্থ ছিলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর তার মায়ের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এর দুই দিন পর বাবারও ডেঙ্গু ধরা পড়ে। নিজের জ্বরকে তিনি গর্ভকালীন কোনো শারীরিক সমস্যা মনে করায় প্রথমে হাসপাতালে যাননি।
১৯ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ তার শরীর থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা আইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেখানেও আইসিইউ শয্যা না থাকায় স্বজনেরা তাকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে থাকেন। কোথাও শয্যা খালি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
পরদিন ভোরে মারা যান সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুমাইয়া। তার গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মায়ের মৃত্যুর পরও বিষয়টি বুঝতে পারেনি ছোট্ট কেয়া। সে শুধু মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর স্বজনদের কাছে জানতে চাইছে, ‘আমার সোনা মা কোথায়?’
সুমাইয়ার এক স্বজন জানান, শেষ সময়ে তাকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও আইসিইউ শয্যা না থাকায় একাধিক হাসপাতালে নিতে হয়। তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পরে মৃত্যুসনদে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
মায়ের মৃত্যুর পর বর্তমানে কেয়াকে দেখাশোনা করছেন তার খালা মারজিয়া। পরিবারের অন্য সদস্যরাও তাকে আগলে রাখছেন। মারজিয়া জানান, কেয়া এখনো মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে পারেনি। বারবার মাকে খুঁজে জানতে চাইছে, ‘আমার সোনা মা কোথায়?’



