ডোবার ওপর টিনের চালায় কাটছে আশির্ধ্ব কৈলাশের শেষ জীবন

রিফাতুন্নবী রিফাত, গাইবান্ধা থেকে: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রামের এক কোণে ডোবার ওপর বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি টিনের চালা। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই সেটিই একজন মানুষের বসবাসের স্থান। কাছে গেলেই চোখে পড়ে আশির্ধ্ব বৃদ্ধ কৈলাশকে। জীবনের শেষ বয়সে এই ছোট্ট টিনের চালাই এখন তাঁর একমাত্র আশ্রয়। সেখানেই কাটছে তাঁর দিন-রাত ও সুখ-দুঃখ আর জীবনের শেষ অধ্যায়।
কৈলাশের জীবন যেন নদীভাঙনের নির্মম ইতিহাস। বহু বছর আগে তিস্তা নদীর ভাঙনে হারিয়ে যায় তাঁর নিজের ভিটেমাটি। মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। এরপর আশ্রয় নেন বড় বোন সিন্ধু বালার বাড়িতে। বোনের সংসারের নানা কাজ করে বছরের পর বছর সেখানেই কাটিয়ে দেন। নিজের সংসার গড়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি। চিরকুমার হিসেবেই পার করে দিয়েছেন পুরো জীবন।
সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, কমেছে শরীরের শক্তি। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। শ্রবণশক্তিও অনেকটাই হারিয়েছেন। এরই মধ্যে মারা গেছেন তাঁর বড় বোন ও দুলাভাই। একসময় যে বাড়িটিকে নিজের আশ্রয় মনে করতেন, আজ সেখানে তাঁর জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। বাধ্য হয়েই বাড়ির পাশের ডোবার ওপর বাঁশের খুঁটি ও টিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি চালায় বসবাস শুরু করেন তিনি।
চালাটির ভেতরে নেই প্রয়োজনীয় কোনো আসবাবপত্র। একটি খাট আর কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়েই তাঁর বসবাস। বর্ষা মৌসুম এলেই বাড়ে দুর্ভোগ। ঝড়-বৃষ্টির রাতে টিনের চালা দুলতে থাকে, আর নিচে ডোবা থাকায় নিরাপত্তাহীনতায় কাটে প্রতিটি মুহূর্ত। মশার কামড় তাঁর নিত্যসঙ্গী। নিয়মিত খাবারেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোমতে দুবেলা আহার জোটে। অসুস্থ হলেও অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পান না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কৈলাশের মতো একজন অসহায় বৃদ্ধের নিরাপদ বাসস্থান, নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এলাকাবাসীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁরা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত সহায়তার দাবি জানান।
প্রতিবেশীদের ভাষ্য, যৌবনে কৈলাশ কঠোর পরিশ্রম করে অন্যের সংসারে অবদান রেখেছেন। কিন্তু বার্ধক্যে এসে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। কর্মক্ষমতা হারানোর পর আজ তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
কৈলাশের জীবনের এই করুণ বাস্তবতা শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; এটি নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের অসহায়ত্ব, দারিদ্র্য, বার্ধক্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার এক বাস্তব চিত্র।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘কৈলাশের বিষয়টি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। তিনি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত একটি নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন আশির্ধ্ব এই বৃদ্ধ। সামান্য মানবিক সহায়তাই বদলে দিতে পারে কৈলাশের জীবনের শেষ অধ্যায়।



