বাংলাদেশ

বালিশ-কাণ্ডের চেয়েও বড় দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এলো রূপপুরে

বাংলা টিভি ডেস্ক: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বহুল আলোচিত বালিশকাণ্ডের পর এবার আরও বড় পরিসরের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি উঠেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শুধু আবাসন প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় নয়, যন্ত্রপাতি কেনায় অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, বিল পরিশোধে অসঙ্গতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রগতি, তদারকি ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

২০১৬ সালে শুরু হওয়া রূপপুর প্রকল্পে দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে সময় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়ও একাধিক ধাপে বেড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ নিরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আপত্তি এসেছে গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্প ঘিরে। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পে নির্মাণকাজ, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনায় সরকারি মূল্য বিবেচনায় প্রায় ২৭ কোটি টাকার পণ্যের জন্য ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পের আলোচিত বালিশ কেনার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা দেখানো হয়, যেখানে প্রকৃত মূল্য ছিল অনেক কম। এ ঘটনায় প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিরীক্ষকদের মতে, এটি প্রকল্পের সামগ্রিক অনিয়মের তুলনায় একটি ছোট অংশ।

এদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি এবং প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজের তালিকা ও হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের নিয়মিত কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত হালনাগাদ পরিকল্পনা গ্রহণ, অসমাপ্ত কাজ চিহ্নিত করা এবং নিয়মিত তদারকির সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

তবে রূপপুর প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এত বড় পরিমাণ অডিট আপত্তি তৈরি হওয়ার কথা নয়। তিনি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরেন।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button