গির্জা থেকে যেভাবে মসজিদে রূপান্তর হলো আয়া সোফিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত আয়া সোফিয়া বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই স্থাপনায় বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয় দেখা যায়। একই সঙ্গে এটি খ্রিস্টান ও ইসলামী সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহন করে আসছে।
প্রথমদিকে এটি ছিল খ্রিস্টান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গির্জা। পরে ১৪৫৩ সালে উসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহের হাতে কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের পর আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের পর তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৩৫ সালে এটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়। তবে ২০২০ সালে আবারও এটি মসজিদের মর্যাদা ফিরে পায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, ষষ্ঠ শতক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আয়া সোফিয়ায় বহুবার সংস্কারকাজ চালানো হয়েছে। ভূমিকম্প, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সময়ের ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে স্থাপনাটিতে অন্তত কয়েক ডজন বড় ধরনের মেরামত করা হয়েছে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
নামের ইতিহাস
আয়া সোফিয়ার প্রাচীন নাম ছিল ‘মেগালি এগ্লিসিয়া’, যার অর্থ ‘বড় গির্জা’। পরবর্তীতে গ্রিক শব্দ ‘হাগিয়া সোফিয়া’ থেকে এর নামকরণ হয়, যার অর্থ ‘পবিত্র প্রজ্ঞা’। উসমানীয় যুগে এটি ‘আয়া সোফিয়া কাইর জামি শরিফ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
মসজিদে রূপান্তরের পর এখানে ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, মেহরাব, মিম্বার ও মিনার সংযোজন করা হয়। উসমানীয় সুলতানদের আমলে ভবনটির সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব বাড়াতে বিভিন্ন সংস্কার ও সংযোজন করা হয়।
অনন্য স্থাপত্যশৈলী
আয়া সোফিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল গম্বুজ। প্রায় ৩১ মিটার ব্যাসের এই গম্বুজ মাটি থেকে প্রায় ৫৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এর চারপাশে রয়েছে অসংখ্য জানালা, যা ভেতরে আলো প্রবেশের বিশেষ পরিবেশ তৈরি করে।
ভবনটি মার্বেল পাথর, ইট, টালি ও মোজাইকে সাজানো। এর অভ্যন্তরের নকশায় বাইজেন্টাইন খ্রিস্টীয় শিল্প এবং উসমানীয় ইসলামী অলঙ্করণের মিশ্রণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
স্থাপত্যগত দুর্বলতা কাটাতে উসমানীয় আমলের বিখ্যাত স্থপতি মিমার সিনান গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করেন। তার নির্মিত সহায়ক কাঠামো ও মিনারগুলো ভবনটির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
গির্জা থেকে মসজিদ
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময় আয়া সোফিয়া কয়েকবার ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কাঠামোটি মূলত সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আমলে ৫৩২ থেকে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়।
প্রায় ৯০০ বছর এটি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্রধান গির্জা। ১২০৪ সালের ক্রুসেডের সময় এটি কিছু সময়ের জন্য ক্যাথলিক গির্জায় রূপান্তরিত হয়েছিল। পরে আবার অর্থোডক্স গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৪৫৩ সালে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের পর সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ এটিকে প্রধান মসজিদ হিসেবে ঘোষণা করেন। একই বছর সেখানে প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উসমানীয় আমলে পরিবর্তন
মসজিদ হওয়ার পর আয়া সোফিয়ায় একের পর এক পরিবর্তন আনা হয়। মিনার নির্মাণ, ক্যালিগ্রাফি স্থাপন, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, ফোয়ারা ও অন্যান্য স্থাপনা যুক্ত করা হয়।
সুলতানদের কাছে আয়া সোফিয়া শুধু একটি মসজিদ ছিল না, এটি ছিল সাম্রাজ্যের শক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই বিভিন্ন সময়ে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১৮৪৭ থেকে ১৮৪৯ সালের মধ্যে সুলতান আবদুল মজিদের নির্দেশে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। এ সময় গম্বুজ, মিনার ও অভ্যন্তরের বিভিন্ন অংশ মেরামত করা হয়।
জাদুঘর থেকে পুনরায় মসজিদ
তুরস্কে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর আয়া সোফিয়ার ধর্মীয় ব্যবহার বন্ধ করে ১৯৩৫ সালে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে এটিকে আবার মসজিদে ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হয়। বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২০ সালের ১০ জুলাই তুরস্কের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত জাদুঘরের মর্যাদা বাতিল করে।
এরপর প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দেন। ২০২০ সালের ২৪ জুলাই সেখানে আবার জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
আজ আয়া সোফিয়া শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি বিশ্ব ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সভ্যতার ছাপ একসঙ্গে মিশে আছে।
সূত্র : আল জাজিরা



