গ্রাম বাংলাদেশবাংলা

গ্রামের নাম শুনেই ভেঙে যায় বিয়ের সম্পর্ক

গাইবান্ধা (ডিজিটাল) প্রতিনিধি: “আপনার বাড়ি কোথায়?” এ প্রশ্নের জবাবে “রাইগ্রাম” বলতে এখনও অস্বস্তি বোধ করেন অনেক তরুণ-তরুণী। কারণ গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরসভার এই গ্রামের নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে একটি পরিচিত উপাধি ‘হেরোইনপল্লি।’

দীর্ঘ চার দশক ধরে মাদক ব্যবসার কারণে কুখ্যাত হয়ে ওঠা রাইগ্রামের এই পরিচয় শুধু গ্রামের সুনামই নষ্ট করেনি, সামাজিক জীবনেও ফেলেছে গভীর নেতিবাচক প্রভাব।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামের নাম শুনেই অনেক পরিবার ছেলে-মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। সম্ভাবনাময় অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় শুধু একটি গ্রামের পরিচয়ের কারণে।এমন বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি মানসিক কষ্টে রয়েছেন নিরীহ বাসিন্দারা।

পলাশবাড়ী পৌরসভা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাইগ্রাম। বাইরে থেকে দেখলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্য সাধারণ গ্রামের মতোই কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য, এই গ্রামের আড়ালে বহু বছরের একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।

তাদের দাবি, প্রায় ৪০ বছর আগে আবদুল জব্বারের হাত ধরে শুরু হয়েছিল মাদক ব্যবসা। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যবসা বিস্তার লাভ করে। ফেনসিডিল ও গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের কেনাবেচার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায় রাইগ্রাম। বর্তমানে এই ব্যবসার সঙ্গে একাধিক পরিবার জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ এমনকি কিছু নারীও এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

গ্রামবাসীর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, কয়েকজনের অপরাধের দায় আজ পুরো গ্রামের মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের কাছে নিজেদের গ্রামের পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করে। চাকরি, বিয়ে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারিদের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। যারা সাহস করে মুখ খুলেছেন, তাদের কেউ কেউ লাঞ্ছনা, হুমকি ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে অনেক অভিযুক্ত আবারও একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ফলে রাইগ্রামে এখনও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা বন্ধ হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাইগ্রামকে মাদকমুক্ত করার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, শুধু অভিযানে গ্রেপ্তার করলেই হবে না; মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যারা মাদক ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জরুরি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আবদুল জব্বারের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গাইবান্ধা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাইগ্রামে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব বলেন, ‘শুধু পুলিশের পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা থেকে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম লেবু বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

চার দশকের মাদকের অভিশাপে একটি গ্রামের স্বাভাবিক পরিচয় আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। কয়েকজন অপরাধীর কারণে পুরো গ্রামের মানুষকে বহন করতে হচ্ছে অপবাদ ও সামাজিক বঞ্চনা। রাইগ্রামবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা ‘হেরোইনপল্লি’ নয়, তাদের গ্রাম আবার পরিচিত হোক একটি নিরাপদ, স্বাভাবিক ও মাদকমুক্ত জনপদ হিসেবে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button