‘কবুল’ ছাড়াও যেসব শব্দ উচ্চারণ করলেই বিয়ে হয়ে যায়

বাংলা টিভি ডেস্ক: নিকাহে শুধু ‘কবুল’ বললেই হবে? হানাফি ফিকহ কী বলে
ইসলামে বিয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি বৈধ ও পবিত্র বন্ধন। এই সম্পর্ক মানুষের চরিত্র সংরক্ষণ, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং দ্বীনের বিধান মেনে জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, “যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করল। এরপর বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (বায়হাকি, শুআবুল ইমান)
আরেক হাদিসে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য ‘ইজাব’ (বিয়ের প্রস্তাব) ও ‘কবুল’ (গ্রহণ) অপরিহার্য। তবে শুধু ‘আমি কবুল করলাম’ বলাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়। সম্মতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে—এমন অন্য শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করেও নিকাহ সহিহ হতে পারে।
নিকাহ সহিহ হওয়ার মৌলিক শর্ত
হানাফি ফিকহে নিকাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়—
- এক পক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব (ইজাব) থাকতে হবে।
- অপর পক্ষকে সেই প্রস্তাবে সুস্পষ্ট সম্মতি (কবুল) জানাতে হবে।
- ব্যবহৃত শব্দে বিয়ের অর্থ স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে।
- দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন মুসলিম পুরুষ ও দুইজন মুসলিম নারী সাক্ষীর উপস্থিতি থাকতে হবে।
‘কবুল’ ছাড়াও যেসব শব্দে নিকাহ সম্পন্ন হতে পারে
ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, নিচের শব্দগুলোও সম্মতির স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য—
- قَبِلْتُ (ক্ববিলতু): অর্থ—‘আমি গ্রহণ করলাম।’
- رَضِيتُ (রদ্বিতু): অর্থ—‘আমি রাজি হলাম’ বা ‘আমি সন্তুষ্ট হলাম।’
- تَزَوَّجْتُهَا (তাজাওয়াজ্জাতুহা): অর্থ—‘আমি তাকে বিবাহ করলাম।’
- أَنْكَحْتُ نَفْسِي إِيَّاهُ (আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু): অর্থ—‘আমি নিজেকে তার সঙ্গে বিবাহ করলাম।’
- أَجَزْتُهُ (আজাযতুহু): অর্থ—‘আমি এটি অনুমোদন করলাম।’ বিশেষ করে প্রতিনিধি বা ওকিলের মাধ্যমে নিকাহ হলে এ ধরনের অনুমোদন গ্রহণযোগ্য।
ফিকহি গ্রন্থে যা বলা হয়েছে
হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, আল-হেদায়া এবং আদ-দুররুল মুখতার মাআ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করা হয়েছে, নিকাহ এমন সব স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে, যা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের অর্থ পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করে। যেমন—‘তোমাকে বিবাহ করলাম’, ‘আমি গ্রহণ করলাম’, ‘আমি রাজি হলাম’ ইত্যাদি।
কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতঃপর হয় ভদ্রভাবে স্ত্রীকে রেখে দাও, অথবা সম্মানের সঙ্গে তাকে বিদায় দাও।” (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, “নিকাহ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।” (সুনান ইবনু মাজাহ)
এসব দলিল থেকে ইসলামী আইনবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন, নিকাহের মূল ভিত্তি হলো উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট সম্মতি; নির্দিষ্ট একটি শব্দ উচ্চারণই একমাত্র শর্ত নয়।
উপসংহার
হানাফি ফিকহের আলোকে, ‘কবুল’ শব্দের পরিবর্তে এমন যেকোনো স্পষ্ট শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বিয়ের সম্মতি ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের অর্থ প্রকাশ করে। তবে নিকাহ সহিহ হওয়ার জন্য সাক্ষীর উপস্থিতি, যথাযথ প্রেক্ষাপট এবং বক্তব্যের স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
তবে বিভ্রান্তি বা ভবিষ্যতের বিরোধ এড়াতে অধিকাংশ ফকিহ প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ‘আমি কবুল করলাম’ বলেই নিকাহ সম্পন্ন করাকে উত্তম বলে মত দিয়েছেন।



