কলকাতার হাসপাতাল ও পর্যটন ব্যবসায় ধস, বাংলাদেশি পর্যটক কমেছে ৭৩ শতাংশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকদের যাতায়াত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। গত এক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ শতাংশ কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কলকাতার হাসপাতাল, হোটেল, শপিং মার্কেট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
একসময় চিকিৎসা, কেনাকাটা ও অবকাশযাপনের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কলকাতায় যাতায়াত করতেন। শুধু কলকাতা নয়, চিকিৎসার প্রয়োজনে দিল্লি, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুমুখীও হতেন অনেকে। বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকদের উপস্থিতিতে কলকাতার হাসপাতাল, হোটেল এবং বিভিন্ন বিপণিবিতান ছিল বেশ সরগরম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ বাংলাদেশি ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৫-২৬ সালের হিসাবে এই সংখ্যা কমে প্রায় ৪ লাখ ৬৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। যদিও চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশিত হয়নি।
গত ১৮ আগস্ট কলকাতার নিউমার্কেট থানা এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় সাত বাংলাদেশিসহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। এরপর বাংলাদেশি পর্যটকদের ভারতে যাতায়াতে আরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশি পর্যটক কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অন্যতম। শিখা ইন হোটেলের অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি এখনো অনেক পর্যটকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে রেখেছে। পাশাপাশি ভারতীয় ভিসা পেতে দীর্ঘসূত্রতা, আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, সীমিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেকেই ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের সংকট এবং বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকের পক্ষেই ভারতে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও পর্যটক কমার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব পড়ে ভিসা কার্যক্রম ও সীমান্ত পারাপারেও।
একই সঙ্গে বাংলাদেশি পর্যটকদের বিদেশ ভ্রমণের গন্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। ভারতের পরিবর্তে এখন অনেকেই থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কের মতো দেশ বেছে নিচ্ছেন। তুলনামূলক সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী ভ্রমণ প্যাকেজ এসব দেশের প্রতি বাংলাদেশিদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, কলকাতার কিছু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশি রোগীদের মধ্যে। বাংলাদেশের নাগরিক আবু বক্কর নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, পায়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতার মুকুন্দপুর এলাকার একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে চিকিৎসা শুরুর আগেই ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
আবু বক্করের অভিযোগ, চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে ওষুধ না দিয়ে প্রথমেই একাধিক পরীক্ষার নির্দেশ দেন। তাঁর মতে, অন্তত কয়েক দিনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া যেত। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিনই ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি। ভবিষ্যতে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে থাইল্যান্ড কিংবা অন্য কোনো দেশে যাওয়ার কথা ভাববেন বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশি রোগী ও পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কলকাতার অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেও প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে হোটেল ব্যবসা, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, বিপণিবিতান এবং ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর আয় কমে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রোগীরা ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজম খাতের অন্যতম প্রধান গ্রাহক ছিলেন। প্রতিবছর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যেতেন।
কলকাতা মার্কুইস স্ট্রিট ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির হায়দার আলী বলেন, ভিসা জটিলতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন কমতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে শিখা ইন হোটেলের অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তবে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের যাতায়াতেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশিদের ভারতে যাতায়াত কমলেও বিদেশ ভ্রমণে ভারতীয়দের আগ্রহ বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ কোটি ২৭ লাখের বেশি ভারতীয় নাগরিক বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
ভারতীয় পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ ও নেপাল। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক কম খরচের পর্যটন প্যাকেজ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ও চিকিৎসাসেবা খাতের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে মেডিকেল ও ট্যুরিস্ট ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কলকাতার পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে চিকিৎসা, কেনাকাটা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আবারও বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়বে। এতে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারবেন তাঁরা।



