বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো সংকটে, ৭ দফা সমাধান চায় অ্যাটকো

বাংলা টিভি ডেস্ক: দেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও পরিচালনগত সংকটের মুখে পড়েছে। ডিজিটাল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তার, টিআরপি নির্ধারণে অস্বচ্ছতা, বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, কনটেন্ট পাইরেসি এবং সম্প্রচার ব্যয় বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু সমস্যাকে এর জন্য দায়ী করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো)।
এসব সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের কাছে নীতিগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সাতটি বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
অ্যাটকো সভাপতি অঞ্জন চৌধুরীর স্বাক্ষর করা এক আবেদনে বলা হয়েছে, মুক্ত গণমাধ্যমের বিকাশ, নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন ও সুস্থ বিনোদন নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বেসরকারি টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সময়োপযোগী নীতিমালার অভাব, পরিবর্তিত ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ শিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে। অ্যাটকোর প্রথম প্রস্তাবে ডিজিটাল মিডিয়া ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে কার্যকর নীতিমালার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ডিজিটাল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনি আয়ের বড় একটি অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও কর কাঠামো কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
টেলিভিশনের দর্শক পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক টিআরপি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অ্যাটকো। সংগঠনটির মতে, বিদ্যমান টিআরপি ব্যবস্থা নিয়ে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন রয়েছে। এর ফলে বিজ্ঞাপন বাজারে চ্যানেলগুলোর প্রকৃত দর্শকপ্রাপ্তির প্রতিফলন ঘটছে না। তাই সরকারি তদারকিতে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও সর্বজনগ্রাহ্য টিআরপি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন খাতের বকেয়া বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতাকেও বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে অ্যাটকো। তাদের দাবি, বিজ্ঞাপন সংস্থা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওনা অর্থ পেতে অনেক সময় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের ন্যূনতম মূল্যহার বা ‘ফ্লোর প্রাইস’ না থাকায় চ্যানেলগুলো আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শুধু বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী পে-টিভি বা পে-চ্যানেল ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেছে অ্যাটকো। পে-ক্যাবল নেটওয়ার্ক সার্ভিস চালু হলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্য বিকল্প রাজস্বের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
সম্প্রচার সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, স্যাটেলাইট ফি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। অ্যাটকোর মতে, একদিকে চ্যানেল পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিজ্ঞাপনসহ প্রচলিত আয়ের উৎস সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অনেক চ্যানেলই তারল্য সংকটে পড়ছে।
কনটেন্ট পাইরেসি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে অ্যাটকো। তাদের অভিযোগ, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর নিজস্ব বিনিয়োগে তৈরি সংবাদ, অনুষ্ঠান ও অন্যান্য কনটেন্ট অনুমতি ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কনটেন্ট নির্মাণে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে সরকারি নির্দেশনা, বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন কনটেন্ট সম্প্রচারের জন্য ফি নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছে অ্যাটকো। গত ৩০ মার্চ ২০২৬ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সরকারি নির্দেশনা, বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট সম্প্রচারের বিষয়ে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি সব ধরনের বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান ও কনটেন্ট টেলিভিশনে সম্প্রচারের জন্য ৮ হাজার টাকা ফি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ৩০ শতাংশ ছাড়ের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেলিভিশন স্ক্রলে ২৪ ঘণ্টার জন্য ৩ হাজার টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি।
আবেদনে অ্যাটকো সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ ও নীতিগত সহযোগিতার মাধ্যমে বেসরকারি টেলিভিশন শিল্প বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ও বৈঠকের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি।



