বাংলাদেশ

দাওয়াত না পেয়ে খেপলেন মাতবর, ক্লাসে যাওয়া বন্ধ গ্রামের ৩০ শিক্ষার্থীর

বাংলা টিভি ডেস্ক: ফরিদপুরের সদরপুরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এক মাতবরের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের স্কুলে না পাঠানোর জন্য অভিভাবকদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী গত চার দিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে উদ্বোধনের বিষয়টি জানানোয় অনুষ্ঠানের আগে কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কামরুল হাসান। পরে তিনি স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে সভা করে তাদের সন্তানদের ওই বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার পরামর্শ দেন।

কামরুল হাসান ভাষাণচর ইউনিয়নের নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা আবুল কালাম ওই ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। কামরুল বর্তমানে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার নির্দেশের পরই অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক।

১৯৮৭ সালে ৩৩ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে চারজন শিক্ষক ও ১০৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ভবন নির্মাণের উদ্বোধনের আগে প্রতিদিন গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকত। তবে গত চার দিন ধরে উপস্থিতির সংখ্যা কমে ২৫ থেকে ৩০ জনে নেমে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কামরুল হাসানকে দাওয়াত না দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। পরে অভিভাবকদের নিয়ে সভা করে সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার কথা বলেন। তার প্রভাবের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ আশপাশের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোরও চেষ্টা করছেন।

তারা আরও জানান, একসঙ্গে এত শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। দ্রুত বিষয়টির সমাধান চান তারা।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, হঠাৎ করে এত শিক্ষার্থী স্কুলে না আসায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থী ছাড়পত্র (টিসি) নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী খান বলেন, ভবনের উদ্বোধনের বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ জানানোয় কাউকে আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ ছিল না। বিষয়টি কামরুল হাসানকে জানানো হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। তার দাবি, ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে কামরুল হাসান স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে নিজের বাড়ির পাশের নুর ইসলামের চায়ের দোকানে সভা করেন এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন।

এদিকে পাশের চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভগিরত সাহা জানান, চর চাঁদপুর কোলচুরী বিদ্যালয় থেকে ২৫ থেকে ২৭ জন শিক্ষার্থী অভিভাবকদের সঙ্গে তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছিল। তবে টিসি না থাকায় তাদের কাউকেই ভর্তি করা হয়নি।

ভাষাণচর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. ফরিদ হোসেন বলেন, কামরুল হাসান নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী এলাকার মাতবর হিসেবে পরিচিত এবং ওই এলাকায় তার প্রভাব রয়েছে।

ভাষাণচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. গোলাম কাওসার বলেন, কোলচুরী এলাকার শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না—এমন বিষয় তিনি জানতে পেরেছেন। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কামরুল হাসান। তিনি বলেন, তার বাড়ি ওই এলাকায় হলেও সরকারি চাকরির কারণে তিনি ফরিদপুর শহরে থাকেন। বিদ্যালয়ে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না বলেই হয়তো অভিভাবকেরা সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করতে চাইছেন।

নিজেকে এলাকার মাতবর হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কেউ হয়তো শত্রুতা করে এ কথা বলছে। অথচ এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।’

সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button