দালালের ফাঁদে পড়ে লিবিয়ায় নিখোঁজ লিমন, বাড়িতে মায়ের বুকভাঙা কান্না

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি: উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার পথে লিবিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন মাদারীপুরের শিবচরের তরুণ লিমন ইসলাম (১৮)। ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ২৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে চলতি বছরের ৪ এপ্রিল বাড়ি ছাড়েন তিনি। লিবিয়ায় দালালের বাসায় প্রায় দুই মাস থাকার পর গত চার মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।
সন্তানের সন্ধান না পেয়ে উৎকণ্ঠা আর আহাজারিতে দিন কাটছে লিমনের বাবা-মায়ের। পরিবারের দাবি, লিবিয়ায় থাকা দালাল আবুল বাশারের সঙ্গেও এখন যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। দেশে থাকা তার স্ত্রীও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
জানা গেছে, শিবচর উপজেলার দক্ষিণ ক্রোকচর এলাকার গাড়িচালক সিরাজুল ইসলামের ছেলে লিমন ইসলামকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে স্থানীয় দালাল আবুল বাশার ২৩ লাখ টাকা নেন। চুক্তি অনুযায়ী, ইতালি পৌঁছানোর পর আরও দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। টাকা নেওয়ার পর লিমন লিবিয়ায় পৌঁছালে তাকে আবুল বাশারের বাসায় রাখা হয়।
পরিবারের ভাষ্য, গত ১৪ আগস্ট দালালের বাসায় থাকা অবস্থায় লিমনের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় তার মায়ের। কথা বলার একপর্যায়ে হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকে ওই নম্বরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দালাল আবুল বাশারের ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিবার। তার স্ত্রীও বাড়িতে নেই বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয়দের দাবি, শিবচরের বিভিন্ন এলাকার অনেক তরুণ ইতোমধ্যে এই পথে ইতালি গেছেন। তাদের দেখাদেখি আরও অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তিতে তরুণদের লিবিয়া নেওয়া হয়। পরে সাগরপথে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়।
তবে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক তরুণকে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া এবং মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ সময় তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।
নিখোঁজ লিমনের মা ইয়াসমিন বেগম বলেন, “১৪ আগস্ট শেষবার আমার লিমনের সঙ্গে কথা হয়। তখন সে দালাল আবুল বাশারের বাসায় ছিল। কথা বলার সময় হঠাৎ লাইন কেটে যায়। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে—কিছুই জানি না।”
তিনি আরও বলেন, “দালালের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছি না। ফোন ধরে না, মাঝে মধ্যে বন্ধ পাই। বাড়িতেও কেউ নেই। চার মাস ধরে ছেলের সন্ধানে আছি। আমার ছেলে যেন ফিরে আসে, আমি আর কিছু চাই না।”
লিমনের বোন লামিয়া বলেন, “লিবিয়া যাওয়ার পরই আমার ভাইকে ‘গেম’ দেওয়ার কথা ছিল। ১৪ আগস্ট দালালের বাসায় থাকা অবস্থায় ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়। সে ভালো আছে বলেছিল। প্রায় এক মিনিট কথা হওয়ার পর লাইন কেটে যায়। এরপর ওই নম্বরে আর ফোন ঢোকে না। ভাইকে ‘গেম’ দেওয়া হয়েছে কি না, আমরা কিছুই জানি না।”
তিনি আরও বলেন, “২৩ লাখ টাকা জোগাড় করতে মায়ের স্বর্ণ বিক্রি করতে হয়েছে। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ এবং ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করা হয়েছে। ভাইয়ের চিন্তায় আমাদের পরিবারের সবকিছু যেন থেমে গেছে।”
লিমনের বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলের কোনো খোঁজ নেই। এতদিন দালালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করিনি। এখন মামলা করব। দালাল বাশারের স্ত্রী আমাদের বাড়িতে এসে নগদ ২৩ লাখ টাকা নিয়েছে। এখন দালালের বাড়িতেও কেউ নেই। সবাই আত্মগোপন করেছে।”
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, গত দুই মাসে শিবচরের বাগমারা, বহেরাতলা, নিখলী, বাঁশকান্দি, ভান্ডারীকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত অর্ধশত যুবক লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দী অথবা নিখোঁজ রয়েছেন।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোপূর্বে যখনই জানতে পেরেছি, নিখোঁজ ও নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়া বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও আমরা কাজ করছি। এ বিষয়ে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।”



