বাংলাদেশ

ভারত থেকে আনা চালে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান, বিতরণ স্থগিত

বাংলা টিভি ডেস্ক: ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়ার পর অবশিষ্ট ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত চাল পরীক্ষা করে এ উপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে পুরো চালান পুনরায় পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সঠিক পরিবেশে সংরক্ষণ না করা হলে চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। তবে পরীক্ষায় পাওয়া উপাদানের মাত্রা এখন পর্যন্ত সহনীয় সীমার মধ্যে রয়েছে বলে জানান তিনি। তার মতে, এই মাত্রা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

গত ১৭ আগস্ট ব্রির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোতে (সিএসডি) সংরক্ষিত চালের স্তূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামের চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট চালের বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় খাদ্য অধিদপ্তর।

হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা চালের সংশ্লিষ্ট লট দুই দফায় পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি ডিপো কর্তৃপক্ষকে চাল বিতরণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন এখনো ডিপোতে এসে পৌঁছায়নি। চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও বিতরণ স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আমদানির পর চালের মান নিয়ে প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ মার্কিন ডলার মূল্যে মোট ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি হয়েছিল। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল এই চাল সরবরাহ করে।

চুক্তির শেষ চালানের প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ নামের জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালগুলো মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতে ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়।

পরে চালের একটি অংশ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানো হয়। তবে গুদামে পৌঁছানোর পর চালের গুণগত মান নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। কয়েকজন কর্মকর্তা চালের মান অত্যন্ত নিম্ন বলে অভিযোগ করেন। এমনকি কিছু চাল খাওয়ার অনুপযোগী বলেও মন্তব্য করেন তারা।

নিম্নমানের অভিযোগের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়। অবশিষ্ট ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করে খাদ্য বিভাগ। পরবর্তীতে চালের মান নিয়ে নতুন করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় অধিদপ্তর। পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান।

আফলাটক্সিন শনাক্তের তথ্য অস্বীকার সরবরাহকারীর

চালের নমুনায় আফলাটক্সিন পাওয়ার বিষয়টি মানতে রাজি নয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, বাংলাদেশি খাদ্য কর্মকর্তা ও তাদের প্রতিনিধিদের যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় চাল চুক্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে বলে ফলাফল পাওয়া যায়।

ই-মেইলে পাঠানো বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা করা যৌথ নমুনাতেও কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলে তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের দাবির সমর্থনে তারা এসজিএসের পরীক্ষার প্রতিবেদনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ পৃষ্ঠার উল্লেখ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চালের গুণগত মান বজায় রাখতে তারা প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। চাল বিতরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগও জানানো হয়নি।

অন্যদিকে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবরের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তার আশঙ্কা, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে খাদ্যশস্য পাঠাতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।

পরীক্ষার ফল নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা

চালের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে খাদ্য বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের কারণে পুরো বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে সংগৃহীত নমুনা দিয়ে পুরো চালানের প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এখন পর্যন্ত পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া আফলাটক্সিনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিতরণ স্থগিত রাখা চালের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং অন্যান্য সরকারি গুদামে থাকা চালও নতুন করে পরীক্ষার আওতায় আসবে কি না, সে বিষয়েও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button