কোনো জাল ফেলব না জাটকা ইলিশ ধরব না

জাতীয় মাছ ইলিশ আমাদের দেশের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। অনাদিকাল থেকেই আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আমিষজাতীয় খাদ্য সরবরাহে এ মাছ অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বাঙালির দেশপ্রেম যতখানি, ইলিশপ্রেম তার চেয়ে কম নয়। তাই তো সম্প্রতি দেশের কয়েকটি জেলার নাম ব্র্যান্ডিং হয়েছে ইলিশের নামের সংশ্লিষ্টতায়।
এ বাংলায় বাঙালির বর্ষবরণ থেকে শুরু করে ঘরোয়া অনুষ্ঠান যেমন ইলিশ ছাড়া হয় না, তেমনি ওপার বাংলায়ও জামাইষষ্ঠীতে ইলিশ লাগে। তা ছাড়া সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ বাঙালিও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ইলিশ খেতে ভোলে না। কিন্তু এত স্বাদের মাছটি দিন দিন হয়ে যাচ্ছে দুষ্প্রাপ্য, দুর্মূল্য। আর দুষ্প্রাপ্যতা ও দুর্মূল্যতাকে জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করতে সরকার দেশব্যাপী নানান কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে।
এসব কর্মসূচির আওতায় এবারও ১৬ মার্চ থেকে ২২ মার্চ ২০১৯ মেয়াদে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উদযাপিত হবে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘কোনো জাল ফেলবো না- জাটকা ইলিশ ধরবো না’। ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে জাটকা রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা এবং প্রচারণার মাধ্যমে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়াই এ সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য।
ইলিশের ডিম পরস্ফুটনের মাধ্যমে ইলিশের বাচ্চা ‘জাটকা’ তৈরি হয়। ইলিশের পোনাকে (১০ ইঞ্চি/ ২৫সেন্টিমিটারের নিচে) জাটকা বলা হয়। আজকের জাটকাই আগামী দিনের ইলিশ। জাটকা নির্বিচারে ধরা হলে ইলিশের উৎপাদন কমে যায়। জাটকা নদ-নদীতে বিচরণ করে। তখন জেলেরা নির্বিচারে জাটকা আহরণ করতে চায়। নির্বিচারে জাটকা ধরা হলে ইলিশ উৎপাদন ও আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা জাটকা মাছ ইলিশ মাছের নতুন প্রজন্মের প্রবেশন স্তর।
ইলিশের জীবনচক্র বেশ বৈচিত্র্যময়। এরা সাগরের লোনাপানিতে বসবাস করে; প্রজনন মৌসুমে ডিম দেয়ার জন্য উজান বেয়ে মিঠা পানিতে চলে আসে। একটি ইলিশ তিন থেকে ২১ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। মিঠাপানিতে ডিম দেয়ার পর ২২-২৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা হয় এবং ৫-১৫ সেন্টিমিটার আকার পর্যন্ত ৫-৭ মাস এরা নদীতে থাকে। পরে আবার সাগরের দিকে ধাবিত হয়।
ইলিশ ১-২ বছর বয়সে (২২-২৫ সেন্টিমিটার আকারের পুরুষ; ২৮-৩০ সেন্টিমিটার আকারের স্ত্রী) প্রজননক্ষম হয়। তখন এরা আবার মিঠাপানির দিকে গমন করে। তখনই সাগর মোহনায় স্ত্রী ইলিশমাছ অপেক্ষাকৃত বেশি ধরা পড়ে। ইলিশমাছ সারা বছরই কম-বেশি ডিম দেয়; তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরই হচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম।
অক্টোবর অর্থাৎ আশ্বিন মাসের প্রথম পূর্ণিমার ভরা চাঁদে ওরা প্রধানত ডিম ছাড়ে। এ জন্য আশ্বিনের বড় পূণির্মার আগের চারদিন, পূর্ণিমার দিন এবং পরের ১৭ দিন (৪+১+১৭) ইলিশ আহরণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন, মজুদ ও বিনিময় কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তাই এ লক্ষ্যে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম অর্থাৎ গত বছরও ৭ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন প্রজননক্ষেত্রের ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার।
বাংলাটিভি/রাজু



