মধ্যপ্রাচ্যে সং/ঘা/তে ট্রাম্পের দুর্বলতা, চীনের কৌশলগত সুযোগ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা নতুন করে আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং ওয়াশিংটন তার মনোযোগ ও সম্পদ এই অঞ্চলে বেশি কেন্দ্রীভূত করে, তাহলে এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে—যার সুবিধাভোগী হতে পারে চীন।
সরকারিভাবে বেইজিং হামলার সমালোচনা করেছে। চীন আন্তর্জাতিক আইন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। তবে কূটনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে পরিস্থিতির কৌশলগত দিকটিও তারা বিবেচনায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সক্রিয়তা সাময়িকভাবে কমতে পারে। এতে তাইওয়ান ইস্যুসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রশ্নে বেইজিং বাড়তি সময় ও কৌশলগত সুযোগ পেতে পারে।
তবে এই সংকট চীনের জন্য সম্পূর্ণ সুবিধাজনক নয়। জ্বালানি সরবরাহ বড় উদ্বেগের বিষয়। ধারণা করা হয়, ইরান থেকে রপ্তানিকৃত তেলের বড় অংশই চীন ক্রয় করে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এসব তেলের উৎস অনেক সময় অন্য দেশের নামে দেখানো হয়। সংঘাত বাড়লে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা চীনের শিল্প ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।
এর আগে ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়া থেকে সস্তা জ্বালানি আমদানিও নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে অনিশ্চিত হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে চীনের উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।
২০২১ সালে চীন ও ইরানের মধ্যে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও ইরানের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরকার পরিবর্তন হলে এই দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, নতুন সামরিক উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে পেন্টাগন বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। এসব আধুনিক অস্ত্রে গ্যালিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ব্যবহৃত হয়, যার সরবরাহে চীনের প্রভাব রয়েছে। অতীতে বাণিজ্য উত্তেজনার সময় বেইজিং এই খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে বৈশ্বিক শিল্পখাতে চাপ তৈরি করেছিল। ফলে প্রয়োজন হলে এই খনিজ সরবরাহও কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান সম্প্রতি সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশন এবং ব্রিকস–এ যোগ দিয়েছে। এছাড়া সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে চীনের মধ্যস্থতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। বর্তমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই কূটনৈতিক সাফল্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, পরিস্থিতি চীনের জন্য একদিকে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও অন্যদিকে বড় ঝুঁকিও তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে এশিয়ায় কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তি—এই তিনটি চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়াই বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।



