বাংলাদেশ

সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অ্যাটকোর উদ্বেগ

বাংলা টিভি ডেস্ক: প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশোধনীতে গণমাধ্যমের স্বাভাবিক কার্যক্রম, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স—অ্যাটকো।

সংগঠনটি সংশোধিত আইনের কয়েকটি ধারা পুনর্বিবেচনা, সংশোধন অথবা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে লিখিত পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে তারা।

অ্যাটকোর মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনীর ৮(২), ২৫, ২৬ক, ২৯ ও ৪১সহ কয়েকটি ধারা বাস্তবায়িত হলে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ধারা ৮(২)-এ কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লকের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে অ্যাটকো।

সংগঠনটির ভাষ্য, ‘অন্যান্য সংস্থা’ বলতে ঠিক কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। এ ধরনের অস্পষ্টতা থাকলে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা ও সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

তাই ‘অন্যান্য সংস্থা’ শব্দবন্ধ বাদ দেওয়া অথবা আইনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নাম ও এখতিয়ার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার সুপারিশ করেছে অ্যাটকো। একই সঙ্গে ‘মানহানিকর’ বা ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’-এর মতো শব্দেরও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

প্রস্তাবিত ধারা ২৫ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে অ্যাটকো। তাদের মতে, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন ও সেক্সটর্শনের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে ‘মানহানি’, ‘হেয় প্রতিপন্ন’ এবং ‘বুলিং’-কে একই ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা যথাযথ নয়।

অ্যাটকোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশেষ করে ‘মানহানি’র পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় সমালোচনামূলক প্রতিবেদন, মতামতধর্মী লেখা কিংবা স্যাটায়ারও আইনের আওতায় চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে গুরুতর সাইবার অপরাধসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধানগুলো বহাল রেখে ‘মানহানি’, ‘হেয় প্রতিপন্ন’ ও ‘বুলিং’ শব্দগুলো বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

প্রস্তাবিত ধারা ২৬(ক)-এর বিরুদ্ধেও অবস্থান জানিয়েছে অ্যাটকো। এই ধারায় সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে।

অ্যাটকোর মতে, ‘গুজব’-এর সংজ্ঞায় ‘অসমর্থিত’, ‘অযাচাইকৃত’ ও ‘সম্ভাবনা রাখে’-এর মতো বিস্তৃত শব্দ ব্যবহারের ফলে সোর্সনির্ভর বা প্রাথমিক পর্যায়ের সংবাদ প্রতিবেদনও আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই কারণে নতুন করে ধারা ২৬(ক) যুক্ত না করার সুপারিশ করেছে টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠনটি।

ধারা ২৯-এ কোনো কোম্পানি অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট মালিক, প্রধান নির্বাহী, পরিচালক, ম্যানেজার, সচিব, অংশীদার বা কর্মকর্তাদের দায়ের পাশাপাশি কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

এ বিষয়ে অ্যাটকোর বক্তব্য, ব্যক্তিগত দায় এবং কোম্পানির দায় ও অর্থদণ্ডের বিধান একই ধারায় থাকায় প্রস্তাবিত উপধারা ২৯(৩) বাদ দেওয়া উচিত।

সংগঠনটি বিশেষভাবে বলেছে, কোনো মিডিয়া হাউস বা টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক, চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক যদি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকেন, তাহলে শুধু পদ বা পরিচয়ের কারণে তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা উচিত নয়।

এ ছাড়া মামলা বা কোনো আইনগত কার্যক্রম শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দেওয়া, বক্তব্য ব্যাখ্যার সুযোগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যথাযথ সময় দেওয়ার প্রস্তাবও করেছে অ্যাটকো।

সাইবার আইনের কিছু অপরাধকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচারের সুযোগ রাখার প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি।

অ্যাটকোর সুপারিশ হলো, সাইবার সুরক্ষা আইনের অপরাধগুলো মোবাইল কোর্টের আওতায় না এনে সাইবার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করা। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় অবৈধ প্রবেশ বা হ্যাকিং, কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইসে বেআইনি প্রবেশ, সাইবার সন্ত্রাস, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, অশ্লীল কনটেন্ট, মানহানিকর তথ্য এবং এসব অপরাধে সহায়তার বিষয়গুলো সাইবার ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে রাখার কথা বলেছে সংগঠনটি।

অ্যাটকো জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তারা স্বীকার করে। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধান রাখা উচিত নয়, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ কিংবা মতপ্রকাশের অধিকারকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সীমিত করার সুযোগ তৈরি করে।

চূড়ান্ত আইন প্রণয়নের আগে তাদের উত্থাপিত পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

অ্যাটকোর প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে একদিকে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা যায়—সে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button