বাংলাদেশ

রাশিয়ায় কাজের স্বপ্ন, ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি রিমেলকে দেশে ফেরাতে সরকারের দ্বারস্থ বাবা-মা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি: অভাবের সংসারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তরুণ রিমেল মিয়া (২৪)। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, বিদেশে কাজ করে আয় করলে বদলে যাবে তাদের জীবন। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। ভালো বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্বের প্রলোভনে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর ইউক্রেন যুদ্ধে বন্দি হয়েছেন তিনি।

প্রায় ১১ মাস ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলেন রিমেলের বাবা-মা। সম্প্রতি একটি ভিডিওতে তাকে জীবিত দেখতে পেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও এখন নতুন উদ্বেগ—কীভাবে যুদ্ধবন্দি ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে।

রিমেল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটী ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের বাসিন্দা। ছোট্ট জরাজীর্ণ ঘরে বেড়ে ওঠা এই তরুণের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে ছিল। সংসারের অভাব দূর করার আশায় স্বজনরা ঋণ করে তাকে বিদেশে পাঠান।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে রাশিয়ায় যান রিমেল। সেখানে যাওয়ার পর প্রথম তিন মাসে তিনি বাড়িতে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পাঠান। তবে পরবর্তীতে নির্মাণকাজ ছেড়ে দেওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

স্বজনদের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার কয়েক মাস পর তাকে বেশি বেতন ও নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে চুক্তিবদ্ধ করা হয়। রুশ ভাষায় লেখা চুক্তির বিষয়বস্তু পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই তাকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রায় এক মাস বাংকারে দায়িত্ব পালনের পর গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

এরপর দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। সম্প্রতি একটি বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে অনলাইনে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যায় রিমেলকে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনরা নিশ্চিত হন, তিনি এখনো জীবিত আছেন।

রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে প্রায় সাত লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে। শোভাগঞ্জ বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান চালিয়ে কোনোভাবে সংসার চালান তিনি। অন্য ছেলে সৌদি আরবে থাকলেও বর্তমানে কাজ না থাকায় সেখান থেকেও তেমন কোনো সহায়তা পান না।

তিনি বলেন, “ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম পরিবারের অবস্থা ভালো করার আশায়। এখন ঋণের বোঝা আর ছেলের চিন্তায় দিন কাটছে।”

রিমেলের মা রেখা বেগম বলেন, “এতদিন জানতাম না আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না। ভিডিওতে তাকে দেখে বুকটা হালকা হয়েছে, আবার যুদ্ধবন্দি অবস্থার কথা ভেবে ভয়ও লাগছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমার ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।”

স্থানীয়রা জানান, দুই ছেলে বিদেশে থাকলেও এখনো পুরোনো ঝুপড়ি ঘরেই বসবাস করছেন রিমেলের বাবা-মা। পরিবারের আশা ছিল বিদেশের আয়ে তাদের জীবন বদলাবে, কিন্তু বর্তমানে তারা ঋণ, অনিশ্চয়তা এবং সন্তানের অপেক্ষার মধ্যে দিন পার করছেন।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি জানান, বিষয়টি তিনি মৌখিকভাবে জেনেছেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়নি। আবেদন পেলে নিয়ম অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

একসময় পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া রিমেল এখন যুদ্ধবন্দি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছে তার পরিবার ও এলাকাবাসী।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button