মা-বাবাহীন দুই ভাইয়ের ঘরে ‘গোল্ডেন এ প্লাসের’ আলো

বাংলা টিভি ডেস্ক: মা নেই, বাবাও নেই। অভিভাবকের ছায়াহীন এক ঘরে বড় ভাইয়ের হাত ধরে বেড়ে ওঠা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মাঝেও থেমে থাকেনি পড়াশোনা। বড় ভাই অর্ণব সরকারের যত্ন, শিক্ষকদের সহযোগিতা আর নিজের অদম্য পরিশ্রমে এসএসসিতে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ+) অর্জন করেছে অরিত্র সরকার।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বাগেরহাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এই কৃতিত্ব অর্জন করে ১৬ বছর বয়সী অরিত্র।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে মোবাইল ফোনে ফলাফল জানার পর অন্যদের মতো আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল দুই ভাইয়ের। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এলেও সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বাবা-মাকে হারানোর গভীর শূন্যতা। বাবা-মা বেঁচে থাকলে হয়তো ঘরে মিষ্টি বিতরণ হতো, স্বজন-প্রতিবেশীদের নিয়ে আনন্দ-উৎসব হতো। কিন্তু তাদের সেই বিশেষ দিনটি কেটেছে অনেকটা নীরবেই।
ফল প্রকাশের পর অরিত্র ও তার ১৯ বছর বয়সী বড় ভাই অর্ণব সারাদিন ঘরেই ছিলেন। সাফল্যের আনন্দের চেয়ে বাবা-মাকে হারানোর বেদনা যেন তাদের কাছে আরও বেশি করে ধরা দিয়েছে।
অরিত্রের বাবা উৎপল সরকার জানাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটি মুদি দোকান চালাতেন। প্রায় দুই বছর আগে তিনি মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের ওপরই এসে পড়ে সংসারের দায়িত্ব। বাবার রেখে যাওয়া দোকানটি কিছুদিন চালানোর চেষ্টা করলেও আর্থিক সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর থেকে টিউশনি করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আসছেন অর্ণব ও অরিত্র। তাদের দেখভালের জন্য রয়েছেন এক খালা (মাসি), যিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দুই ভাইয়ের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন।
এসএসসিতে গোল্ডেন এ+ পাওয়ার পর অরিত্র মোবাইল ফোনে তার প্রিয় শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং সহপাঠীদের উৎসাহের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেছে সে।
অরিত্রের স্বপ্ন ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হয়ে মানুষের জন্য কাজ করা। অন্যদিকে বড় ভাই অর্ণবের লক্ষ্য আইনজীবী হওয়া এবং নির্যাতিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুজনের স্বপ্নই বড়, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক সংকট।
অর্ণবও চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এখন নিজের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। ছোট ভাইয়ের অসাধারণ ফলাফলে আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের ফল নিয়েও আশাবাদী অর্ণব।
বাবা-মায়ের স্নেহ ও ছায়া হারিয়েও দুই ভাই নিজেদের মেধা, শ্রম ও দৃঢ় মনোবলকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যেতে চান। তবে উচ্চশিক্ষার পথে আর্থিক সহযোগিতা তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
অরিত্র ও অর্ণবের আশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকার তাদের পাশে দাঁড়ালে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে পারবেন।
বাগেরহাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুশান্ত কুমার রায় বলেন, ‘অরিত্র অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। সে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ+) পেয়েছে। এতে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, তারা ২০২২ সালের ২৫ জুন বাবাকে এবং ২০২৪ সালে মাকে হারিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অরিত্রের বড় ভাই অর্ণবও একজন মেধাবী ছাত্র। দুই ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
দুই ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতার জন্য অরিত্র সরকারের বিকাশ নম্বর: ০১৭১৬৮২০৬৭৭-এ সহায়তা পাঠানোর আবেদন জানানো হয়েছে।



