গ্রাম বাংলাদেশবাংলাশিক্ষা

ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন মা, দুজনই পেয়েছেন জিপিএ-৫

বাংলা টিভি ডেস্ক: ছেলের সঙ্গে একই সময়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মা। সংসারের দায়িত্ব সামলে ছেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনাও। কখনো সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ নিয়েছেন, আবার কখনো রাত জেগে নিজের বই-খাতা নিয়ে বসেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। অবশেষে সেই অধ্যবসায়ের ফলও পেলেন। এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় মা পেয়েছেন জিপিএ-৫, আর ছেলে পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এই সাফল্যে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে পরিবার ও এলাকাজুড়ে।

সাদিয়া বেগম রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকার বাসিন্দা। প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ের পর তার পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। সংসার ও পারিবারিক নানা দায়িত্বের কারণে তখন বই-খাতা ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পড়াশোনার বাইরে থাকলেও শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কখনো কমেনি।

শেষ পর্যন্ত আবারও বই হাতে তুলে নেন সাদিয়া। নতুন করে শুরু করেন শিক্ষাজীবন। একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে সন্তানদের লালন-পালন ও পড়াশোনার দেখভাল-সবকিছুর পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি।

প্রায় দুই বছর আগে তিনি আরও বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন-ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। পরিবারের সম্মতিতে শুরু করেন পরীক্ষার প্রস্তুতি। সংসারের কাজের ফাঁকে নিয়মিত পড়াশোনা করেছেন। দুই ছেলের পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার জন্যও সময় বের করেছেন।

চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সেই পরিশ্রমের সাফল্য পেয়েছেন সাদিয়া বেগম। রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

অন্যদিকে, তার ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকায় তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা-ছেলেসহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের বন্যা। ফল প্রকাশের পর থেকেই স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে সাদিয়া বেগম বলেন, পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। তবে কখনো হাল ছাড়িনি।

তিনি আরও বলেন, বছর দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেলের সঙ্গে আমিও পরীক্ষা দেব। পরিবারের সম্মতিতে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই চলতি বছর ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিই।

সাদিয়া বলেন, সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, সংসার সামলিয়ে এবং দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি নিজেও পড়ালেখা করে জিপিএ-৫ পেয়েছি। একই সঙ্গে ছেলে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মা-ছেলের এমন সাফল্যে আমরা পুরো পরিবার আনন্দিত।

মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তানভীর আহমেদের কাছেও ছিল অন্যরকম।

তানভীর বলেন, আমি সবচেয়ে সৌভাগ্যবান যে, এবার আমার মায়ের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। কারণ মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়? আমি সেই সৌভাগ্যবান।

মায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার কথাও তুলে ধরে তানভীর বলেন, মা সবসময় আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন। পাশাপাশি নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন, আর আমি পড়ালেখা করতাম।

নিজের এই সাফল্য বাবা-মাকে উৎসর্গ করে তানভীর বলেন, আমার এই কৃতিত্ব আমার বাবা-মাকে উৎসর্গ করছি।

মা-ছেলের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তাঁদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে তাদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

আরিফুল ইসলাম বলেন, আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই। পাশাপাশি তার মাকেও পড়াশোনায় সহযোগিতা করছিলাম।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। স্বামী-সংসার, সন্তান লালন-পালনসহ নানা দায়িত্বের মধ্যেও নিজের পড়াশোনার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি সাদিয়া।

একসময় বিয়ের পর যে পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল, দীর্ঘ বিরতির পর সেটিই আবার শুরু করেন তিনি। বয়সের ব্যবধান তাকে থামাতে পারেনি। সংসারের ব্যস্ততাও পারেনি তার পথ আটকাতে। ছেলে যখন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, তিনিও নিয়েছেন নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি। একই সময়ে বই খুলেছেন, পড়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত একই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনেই অর্জন করেছেন সাফল্য।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button