তিনতলা সাইকেল বানিয়ে তাক লাগিয়েছেন তরুণ ইউসুফ

রিফাতুন্নবী রিফাত, গাইবান্ধা থেকে: পড়াশোনা করেছেন মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। বয়স মাত্র ১৬ বছর। পেশায় সাইকেল মেকানিক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ থেমে গেলেও থেমে থাকেনি কিশোর ইউসুফ আলী আকন্দের কল্পনা ও উদ্ভাবনী চিন্তা। পুরোনো সাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দিয়ে প্রায় তিন মাসের চেষ্টায় তৈরি করেছেন তিনতলা সাইকেল। ব্যতিক্রমী এই সাইকেল চালিয়ে ইতোমধ্যে এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। ইউসুফের স্বপ্ন এখন আরও বড় তৈরি করবেন আকাশে উড়তে পারে এমন সাইকেল।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের এই কিশোরের তৈরি সাইকেলটি দেখলে প্রথমেই চোখ আটকে যায়। একটি সাইকেলের ওপর আরেকটি এভাবে পরপর তিনটি সাইকেল জুড়ে তৈরি করা হয়েছে এটি। স্থানীয়দের কাছে যা রীতিমতো বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দারিদ্র্যের কারণে তৃতীয় শ্রেণির পর আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি ইউসুফের। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে কিশোর বয়সেই স্থানীয় একটি সাইকেল মেরামতের গ্যারেজে কাজ শুরু করেন। সেখানে কাজ করতে করতেই সাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সম্পর্কে তার আগ্রহ ও দক্ষতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু তৈরি করার স্বপ্নও লালন করতেন তিনি।
একসময় বিদেশে তৈরি দোতলা ও তিনতলা সাইকেলের কথা জানতে পারেন ইউসুফ। এরপর নিজের হাতে এমন একটি সাইকেল তৈরির চিন্তা মাথায় আসে তার। কিন্তু স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন ছিল অর্থের। গ্যারেজে কাজ করে পাওয়া বখশিশ ও নাস্তার টাকা থেকে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করতে থাকেন তিনি। প্রায় ছয় হাজার টাকা জমার পর শুরু করেন স্বপ্নের তিনতলা সাইকেল তৈরির কাজ।
পুরোনো সাইকেলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে গ্যারেজের কাজের ফাঁকে চলতে থাকে নির্মাণকাজ। কখনো হ্যান্ডেল তৈরি, কখনো চেইন বসানো বিভিন্ন পর্যায়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তবুও দমে যাননি ইউসুফ। প্রায় তিন মাসের নিরলস চেষ্টার পর অবশেষে তৈরি হয় তার তিনতলা সাইকেল।
সাইকেল তৈরি হওয়ার পর শুরু হয় আরও বড় পরীক্ষা এটি চালানো। প্রথমদিকে বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে অনুশীলন করেন ইউসুফ। ভারসাম্য ঠিক রাখতে গিয়ে কয়েকবার ছোটখাটো দুর্ঘটনাতেও পড়তে হয়েছে তাকে। তবে হাল ছাড়েননি। দীর্ঘদিনের অনুশীলনের পর এখন বেশ দক্ষতার সঙ্গেই নিজের তৈরি তিনতলা সাইকেল চালাতে পারেন তিনি।
ইউসুফের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বদলে গেছে তাকে ঘিরে স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গিও। একসময় যে কিশোরকে সবাই সাধারণ সাইকেল মেকানিক হিসেবে চিনতেন, এখন তার তৈরি তিনতলা সাইকেল দেখতে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। অনেকে তাকে উৎসাহ দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখছেন নতুন সম্ভাবনা।
তবে তিনতলা সাইকেল বানিয়েই থেমে থাকতে চান না ইউসুফ। তার স্বপ্ন এখন আরও বড়। মাটি ছেড়ে আকাশে উড়তে পারবে এমন একটি সাইকেল তৈরি করতে চান তিনি। এ স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সে বিষয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় সহায়তা এখনো তার নাগালের বাইরে। তবু স্বপ্ন দেখতে কোনো বাধা মানছেন না এই কিশোর।
তৃতীয় শ্রেণির পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও নিজের কৌতূহল, শ্রম, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ইউসুফ যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, তা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সুযোগ পেলে তার মতো উদ্ভাবনী তরুণরা আরও বড় কিছু করে দেখাতে পারেন এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।
ইউসুফের তিনতলা সাইকেল যেন সেই সম্ভাবনারই ছোট্ট এক ঝলক। এখন অপেক্ষা, তার নতুন স্বপ্ন আকাশে ওড়ার সাইকেল কখন বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ায়।



