গ্রাম বাংলাদেশবাংলা

‎মোবাইল ক্যামেরায় ভাগ্যবদল, আঞ্চলিক গান-গীতে জনপ্রিয় ‘ভাইরাল রঞ্জু’

রিফাতুন্নবী রিফাত, গাইবান্ধা থেকে: কখনো হানিফ সংকেতের আদলে উপস্থাপনা, কখনো গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় গান ও গ্রাম্য গীত, আবার কখনো খেলায় প্রাণবন্ত ধারাভাষ্যসহ ‎বহুমুখী প্রতিভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন গাইবান্ধার যুবক রঞ্জু মিয়া।

‎একসময় অন্যের মোবাইল ফোন ধার করে ভিডিও বানাতেন তিনি। সেই মোবাইল ক্যামেরাই এখন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের আয় দিয়ে পরিবারের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন ব্যবসা, নির্মাণ করেছেন নতুন বাড়ি। নিজের পরিচয়ে এখন তিনি পরিচিত ‘ভাইরাল রঞ্জু’ নামে।

‎গাইবান্ধা সদর উপজেলার দারিয়াপুর মিয়াপাড়া গ্রামের হায়দার আলীর ছেলে রঞ্জু মিয়া। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। দারিদ্র্যের কারণে মাধ্যমিকের শুরুতেই থেমে যায় তার পড়াশোনা। পরিবারের হাল ধরতে অল্প বয়সেই নেমে পড়তে হয় কাজে। তবে অভাব তার স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

‎রঞ্জুর গল্পের শুরুটা ছিল একেবারেই সাদামাটা। ছিল না দামি ক্যামেরা, ছিল না কোনো স্টুডিও। ছিল শুধু একটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরা আর নিজের প্রতিভাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার অদম্য ইচ্ছা।

‎২০১৮ কিংবা ২০১৯ সালের দিকে একটি খেলায় ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় মুন্না নামে এক যুবক রঞ্জুকে ফেসবুক পেজ খুলে নিজের ভিডিও প্রকাশের পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শই বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। কিন্তু তখন নিজের একটি মোবাইল ফোনও ছিল না তার। অন্যের মোবাইল ধার করে ভিডিও ধারণ করতেন। পরে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি তাকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দিলে শুরু হয় তার নতুন পথচলা।

শুরুতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক ভিডিও তৈরি করলেও তেমন সাড়া পাচ্ছিলেন না রঞ্জু। একসময় ছোটবেলার প্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেতের উপস্থাপনা তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। এরপর নিজের মতো করে উপস্থাপনার একটি স্বতন্ত্র ধরন তৈরি করেন তিনি।

ধীরে ধীরে রঞ্জুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কখনো হানিফ সংকেতের আদলে উপস্থাপনা, কখনো গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় গান ও গীত, আবার কখনো বিভিন্ন খেলায় প্রাণবন্ত ধারাভাষ্য সব মিলিয়ে দর্শকদের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি হয় তার। স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে নানা ধরনের ভিডিও তৈরি করছেন তিনি। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পরিচিতি হয়ে ওঠে ‘ভাইরাল রঞ্জু’।

রঞ্জুর সাফল্যে খুশি স্থানীয়রাও। তাদের ভাষ্য, নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি শুধু নিজের জীবনই বদলাননি, বরং গাইবান্ধার স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও তুলে ধরছেন দেশ-বিদেশের মানুষের সামনে।

একসময় যে পরিবারে একটি মোবাইল ফোন কেনাও ছিল কঠিন, সেই রঞ্জুই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আয় করে পরিবারের ঋণ পরিশোধ করেছেন। গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসা। দারিয়াপুরে রয়েছে তার কাপড়ের শোরুম, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েকজনের। শুধু ব্যবসা নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে নির্মাণ করেছেন নতুন বাড়িও।

‎রঞ্জু মিয়া বলেন, শুরুতে নিজের কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। অন্যের মোবাইল নিয়ে ভিডিও বানাতে হতো। অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু হলেও মানুষের ভালোবাসা ও নিজের পরিশ্রম তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আয় দিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারছেন এটাই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

‎নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কিছু করার স্বপ্ন দেখেন রঞ্জু। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সন্ধানে। ক্যামেরায় তুলে ধরেন মানুষের জীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং হারিয়ে যেতে বসা নানা গল্প। তার কাছে মোবাইল ফোন এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি তার কর্মসংস্থান, পরিচয় এবং স্বপ্ন পূরণের অন্যতম হাতিয়ার।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button