বাংলাদেশপ্রধানমন্ত্রী

স্বজনদের কান্নায় কেঁদেছেন তারেক রহমান, গুমের অন্ধকার থেকে ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ

বাংলা টিভি ডেস্ক: একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা হয়তো একসময় চোখের জলে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু সেই মানুষটি কোথায়—বেঁচে আছেন, নাকি আর নেই—তা জানতে না পেরে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই অপেক্ষার সঙ্গে মিশে থাকে আশা, ভয়, অনিশ্চয়তা আর প্রতিদিন নতুন করে ভেঙে পড়ার কষ্ট।

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি শুধু গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়; একই সঙ্গে এটি তাদের পরিবারগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষা, মায়ের কান্না, স্ত্রীর নিঃসঙ্গতা এবং সন্তানের শূন্যতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। যাদের প্রিয়জন কোনো একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেছেন, তারা আজও জানেন না মানুষটি কোথায়, কী অবস্থায় আছেন কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না।

বাংলাদেশও গুমের এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে গুমের অভিযোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিশন গঠন করে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

এদিকে ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৩১২ জন নেতা-কর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৭ জন আর ফিরে আসেননি। তাদের তুলে নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেই তারা নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি করে পরিবারের গল্প। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছেন একজন মানুষ, একজন মা, একজন বাবা, একজন স্ত্রী কিংবা একটি সন্তান। রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা।

কোনো শিশুর কাছে হয়তো বাবার একটি পুরোনো ছবিই এখন সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি। কোনো মা হয়তো আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—এই বুঝি তার সন্তান ফিরে এল। কোনো স্ত্রী হয়তো এখনো মনে মনে বিশ্বাস করেন, একদিন হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়বেন তার স্বামী। কিন্তু সময় চলে যায়, বছর পেরিয়ে যায়; মানুষটি আর ফিরে আসেন না। অপেক্ষা কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।

গুমের সবচেয়ে নির্মম দিক এখানেই। একজন মানুষকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি এটি পুরো পরিবারকে ঠেলে দেয় এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে। স্বজনেরা জানেন না তাদের প্রিয় মানুষটির কী হয়েছে। ফলে তারা একদিকে যেমন তাকে খুঁজে ফেরেন, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত ভয়, হতাশা ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন।

গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। ২০১৭ সালে ১৯৪টি, ২০১৮ সালে ১৯২টি, ২০১৯ সালে ১১৮টি, ২০২২ সালে ১১০টি এবং ২০২৩ সালে ৬৫টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের লক্ষ্য করে গুমের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন। এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলোর পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের না-বলা কষ্ট। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর পরিবারও সেই দীর্ঘ অপেক্ষার একটি প্রতীক। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে তার সন্ধানের আশায় থেকেছে। তাকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন সময় বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার কোনো সমাপ্তি ঘটেনি।

একটি পরিবারের জন্য এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? মৃত্যুর খবর পেলেও হয়তো মানুষ একসময় বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শোক করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না, কোথায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া মানুষকে এক অদ্ভুত মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে আটকে রাখে। তারা পুরোপুরি শোক করতে পারেন না, আবার আশাটুকুও ছাড়তে পারেন না।

এই যন্ত্রণা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি মানবিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন।

দীর্ঘ এই অন্ধকারের পর গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও দেখা গেছে। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তাদের কথা শোনেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্বজনদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা ও কান্নার কথা শুনে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি তুলে ধরেন।

সেদিনের বক্তব্যগুলো ছিল গভীরভাবে বেদনাদায়ক। কোনো শিশু জানিয়েছে, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। কেউ জানিয়েছে, বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকার সুযোগই তার হয়নি—কারণ বাবা নিখোঁজ হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস।

এই গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয়, গুমের ক্ষত শুধু একজন মানুষের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়ায় পরিবারগুলো।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর দাবি খুবই স্পষ্ট—তারা সত্য জানতে চান এবং বিচার চান। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তাদের জানাতে হবে, প্রিয়জনদের কী হয়েছিল, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাদের নিখোঁজ হওয়ার জন্য কারা দায়ী।

বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিগত সরকারের আমলের গুম-খুনের বিচার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে তার বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের গুম-খুনের দায়ে বিচার না হলে ভবিষ্যতে অন্যায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে বিচার অবশ্যই হতে হবে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ যাচাই এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিশোধ নয়—ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের পথ। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো অপরাধের বিচার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভিত্তিতে হতে পারে না।

শুধু অতীতের ঘটনার বিচার করাই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো নাগরিক গুমের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যেই ২০২৬ সালে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুমের ঘটনায় মৃত্যু হলে কিংবা দীর্ঘ সময়েও নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব না হলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।

এ ধরনের উদ্যোগ কেবল একটি আইন প্রণয়নের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি বড় অঙ্গীকার। নাগরিকের রাজনৈতিক মত, বিশ্বাস বা পরিচয় যা-ই হোক, তাকে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের অপরাধও আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেই—আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একটি পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকবে?

অবশ্যই না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো নাগরিককে তার রাজনৈতিক মত বা পরিচয়ের কারণে অন্যায়ভাবে তুলে নেওয়া হবে না। কোনো পরিবারকে অন্ধকারে রেখে দেওয়া হবে না। কোনো মা সন্তান ফিরে আসার আশায় বছরের পর বছর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। কোনো শিশু বাবার অপেক্ষায় তার শৈশব হারাবে না।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সহানুভূতি প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাদের সত্য জানতে হবে, ন্যায়বিচারের সুযোগ দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মানবিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রকে তাদের বলতে হবে—আপনারা একা নন। আপনাদের কান্না রাষ্ট্র শুনছে। আপনাদের অপেক্ষা রাষ্ট্র দেখছে। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

যে মা আজও সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় আছেন, তার চোখের পানি যেন বৃথা না যায়। যে সন্তান বাবার একটি স্পর্শের অপেক্ষায় বড় হচ্ছে, তার অপেক্ষার যেন একটি উত্তর আসে। যে স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীর ফেরার আশায় দিন গুনছেন, তার দীর্ঘশ্বাসের যেন অবসান ঘটে।

সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত—বাংলাদেশ আর কখনো গুমের অন্ধকারে ফিরে যাবে না। এই রাষ্ট্রে মানুষের জীবন, মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে। অপরাধের বিচার হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই আমাদের প্রত্যাশা একটাই—আর কোনো পরিবারকে যেন প্রিয়জনের ভাগ্য না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়। কোনো মায়ের কান্না যেন রাষ্ট্রের কাছে অদৃশ্য না থাকে। কোনো শিশুর শৈশব যেন বাবার অপেক্ষায় থেমে না যায়।

মানুষের জীবন ও মর্যাদার চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ হতে পারে না। ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক এমন একটি বাংলাদেশ—যেখানে কোনো মানুষ আর কখনো রাষ্ট্রের অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক দিনকাল; আহ্বায়ক, আমরা বিএনপি পরিবার এবং সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button