বাংলাদেশ

সম্পত্তি লিখে দিলেও শেষ বয়সে নিরাপত্তা হারাবেন না দাতা, আসছে নতুন আইন

বাংলা টিভি ডেস্ক: জীবনের দীর্ঘ পরিশ্রমে গড়ে তোলা একটি বাড়ি। সেই বাড়ির উঠানে সন্তানের শৈশবের স্মৃতি, দেয়ালে পরিবারের নানা গল্প। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাবা-মা ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেদের সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেন। কিন্তু মনের এক কোণে থেকেই যায় ভয়—সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর যদি শেষ বয়সে নিজের ঘরেই নিজের জায়গা না থাকে?

বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের পরিচিত এই বাস্তবতায় এবার আইনি সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা স্বামী-স্ত্রী সম্পত্তি দান করার পরও যাতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগদখল করতে পারেন, সে সুযোগ রেখে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। বিলটি পাস হলে নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার আইনগত স্বীকৃতি পেতে পারে।

সম্পত্তি দিলেও থাকবে নিজের অধিকার

প্রস্তাবিত আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো—সম্পত্তি সন্তানের নামে লিখে দেওয়ার পরও বাবা-মা বা অন্য কোনো দাতা যেন নিজেদের বসতবাড়ি কিংবা সম্পত্তির ব্যবহার থেকে বঞ্চিত না হন।

বর্তমানে সম্পত্তি দানের বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থা থাকলেও দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখলের অধিকার নিজের কাছে রেখে সম্পত্তি দান করতে পারবেন—এ বিষয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই।

ফলে সন্তান বা নিকটজনের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেক প্রবীণ বাবা-মা পরবর্তী সময়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মূলত এই জায়গাটিতেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে বিলটি উত্থাপন করেন। পরে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন।

কারা এই সুবিধা পাবেন?

বিলে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ‘আজীবন ভোগদখলের অধিকার’ সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানকে হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী—

বাবা-মা সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
নাতি-নাতনিরাও বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিকে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে।
স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগদখল করতে পারবেন।

অর্থাৎ একজন বাবা তার বাড়িটি সন্তানের নামে লিখে দিলেও দলিলে যদি নিজের আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করেন, তাহলে জীবিত থাকা পর্যন্ত তিনি সেই বাড়িতে বসবাস করতে পারবেন। সন্তানের মালিকানা থাকলেও বাবার জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকার থাকবে।

গ্রহীতা মারা গেলেও দাতার অধিকার থাকবে

বিলটিতে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে। দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যাবে। তবে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার বহাল থাকবে।

অর্থাৎ সম্পত্তির মালিকানা পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের হাতে গেলেও দাতা তার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার হারাবেন না।

এ বিধানটি বিশেষ করে প্রবীণ বাবা-মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর সন্তানের সঙ্গে কোনো কারণে সম্পর্কের অবনতি হলেও দাতার জীবনকালীন বসবাস ও ভোগের অধিকার আইনি সুরক্ষা পাবে।

প্রয়োজন হলে অধিকার পরিবর্তনের সুযোগ

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিশেষ পরিস্থিতির কথাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে আজীবন ভোগদখলের অধিকার পরিবর্তন, প্রত্যাহার বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অসুস্থ বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে জেলা জজের অনুমোদনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ, প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং আবেদনটি সৎ বিশ্বাসে করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।

প্রচলিত দান বা হেবা ব্যবস্থা থাকছে

সরকারের প্রস্তাবিত আইনটি প্রচলিত দান বা হেবা ব্যবস্থাকে বাতিল কিংবা সীমিত করবে না।

সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা এবং আইনস্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি আগের মতোই বহাল থাকবে। নতুন ব্যবস্থাটি হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক পদ্ধতি এবং এটি সব ধর্মের মানুষের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

শেষ বয়সের নিরাপত্তাই মূল ভাবনা

সম্পত্তি মানেই শুধু জমি, বাড়ি কিংবা অর্থের হিসাব নয়। অনেকের কাছে একটি বাড়ি জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। সেই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সন্তানের বেড়ে ওঠা, দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং শেষ বয়সে একটু নিশ্চিন্তে থাকার আকাঙ্ক্ষা।

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন একজন বাবা বা মাকে নিজের সেই শেষ আশ্রয়টুকু হারাতে না হয়—প্রস্তাবিত আইনের মানবিক দিকটি মূলত সেখানেই।

আইনটি পাস হলে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে একদিকে উত্তরসূরির মালিকানা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দাতা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগদখলের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।

অর্থাৎ সম্পত্তি যাবে উত্তরসূরির কাছে, কিন্তু জীবনের শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর ভয় থাকবে না দাতার।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিলটি এখন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপেক্ষায়। বিলটি আইনে পরিণত হলে সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রচলিত ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারে এমন একটি আইনি সুরক্ষা, যা বিশেষ করে প্রবীণ বাবা-মায়ের জন্য হয়ে উঠতে পারে শেষ বয়সের বড় নিশ্চয়তা।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button