বাংলাদেশ

গারো পাহাড়ে মাদক কারবারিদের ‘নিষিদ্ধ এলাকা’, সাংবাদিক ঢুকলেই হত্যার হুমকি

বাংলা টিভি ডেস্ক: শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে মাদক কারবারিদের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও বন্ধ হয়নি মাদক পাচার। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাচারের তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তের কয়েকটি এলাকাকে কার্যত ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কোনো সাংবাদিক প্রবেশ করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হলদীগ্রাম ও রাংটিয়া এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভারত সীমান্তবর্তী এসব অঞ্চল দিয়ে দিন-রাত বিভিন্ন ধরনের মাদক পাচার হচ্ছে। মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন যানবাহন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কয়েকটি যানবাহন আটক ও মাদক উদ্ধার হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

এর আগে মাদক পাচার নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দৈনিক ইত্তেফাকের ঝিনাইগাতী উপজেলা সংবাদদাতা খোরশেদ আলম। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া বাজারে তার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। এ সময় তার মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পুলিশ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করলেও প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও মোবাইল ফোনটি উদ্ধার হয়নি বলে জানা গেছে।

খোরশেদ আলমের দাবি, ২০২৫ সালে নলকুড়া ইউনিয়নের গোমড়া গ্রামের অনাহারি ও গৃহহীন বিধবা সখিনা বেগমকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা আসে। ওই অর্থে তার জন্য একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। ঘর নির্মাণের সময় সেখানে গেলে স্থানীয়ভাবে মাদক পাচারসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য তার কাছে আসে।

তার অভিযোগ, বিষয়টি জানার পর স্থানীয় এক ইউপি সদস্য তাকে ওই এলাকায় যেতে নিষেধ করেন। পরে মাদক পাচার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরই সন্ধ্যাকুড়া বাজারে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের একটি অংশ এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তারা বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষা ও আইনি সুবিধা পেয়ে থাকে। কোনো কারবারি গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়েন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, একটি বিশেষ বংশগোষ্ঠীর কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এমনকি এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম এই কাজে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসীর দাবি, মাদক পরিবহনে অন্তত আটটি কভার্ড ভ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও বাকি চারটি এখনো মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

তবে স্থানীয়দের করা ‘এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত’—এমন দাবির সমর্থনে সরকারি বা নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

গ্রামবাসীরা জানান, ২০২৫ সালে ওই এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি পিকআপভ্যানে করে মাদক নিয়ে ময়মনসিংহের ফুলপুরে যাওয়ার সময় একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অনুসরণ করে। পরে তারা পিকআপভ্যান নিয়ে নকলা উপজেলার একটি পল্লি এলাকায় চলে যায়। সেখানে গরুচোর সন্দেহে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে গণপিটুনিতে মসলেউদ্দিন ও নুর ইসলাম নামে দুজন নিহত হন বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের মৃত্যুর পর পরিবারের অন্য সদস্যরা আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারের অভিযোগ নিয়ে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ঝিনাইগাতী উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেলসহ কমিটির সদস্যরা। সভায় মাদক পাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুকুনুজ্জামান বলেন, এলাকায় মাদক পাচার বন্ধে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম নুর মোহাম্মদ বলেন, তিনি সম্প্রতি থানায় যোগ দিয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি অভিযানে তিন লাখ টাকার বেশি মূল্যের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

তারপরও স্থানীয়দের প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার কীভাবে অব্যাহত রয়েছে? একই সঙ্গে মাদক পাচারের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের যদি হামলা ও হত্যার হুমকির মুখে পড়তে হয়, তাহলে সীমান্তের এসব এলাকায় আসলে কার নিয়ন্ত্রণ চলছে—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button