বাংলাদেশ

ট্রেনে চালু হতেই চুরির হিড়িক: উধাও কোটি টাকার স্টারলিংক ডিভাইস

বাংলা টিভি ডেস্ক: চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছিল উচ্চগতির স্যাটেলাইটভিত্তিক ‘স্টারলিংক’ ওয়াই-ফাই। শুরুতেই যাত্রীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিললেও ছয় মাস না পেরোতেই দামি প্রযুক্তি সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় উদ্যোগটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।

পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা চারটি আন্তঃনগর ট্রেন—উপবন, পারাবত, পর্যটক ও বনলতা এক্সপ্রেসে একাধিকবার স্টারলিংকের সংযোগযন্ত্র চুরির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে স্টারলিংকের ফ্ল্যাট অ্যান্টেনা। বর্তমানে সেখানে শুধু অ্যান্টেনা বসানোর হোল্ডারটি পড়ে আছে।

রেলওয়ে ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চারটি ট্রেনের বিভিন্ন বগি ও ছাদ থেকে ওয়াই-ফাই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি চুরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুরি যাওয়া ডিভাইস নতুন করে স্থাপন করার পরও আবার তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থে কেনা মূল্যবান সরঞ্জামের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে যাত্রীদের ইন্টারনেট সেবা।

বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে চারটি ট্রেনে স্টারলিংক সেবা চালু করা হয়েছিল। উপবন এক্সপ্রেসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র চুরি হয়েছে এবং অন্য ট্রেনগুলোতেও একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবের সঙ্গে তার কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ফাহিমুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে সমন্বিত বৈঠক করা হবে। তার মতে, প্রতিটি ট্রেনে স্টারলিংক স্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। তাই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি এসব মূল্যবান যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

যাত্রীদের ব্যাপক সাড়া

চলতি বছরের ১৩ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে স্যাটেলাইটভিত্তিক স্টারলিংক ইন্টারনেট চালু হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ নির্দেশনায় প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তায় রয়েছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।

প্রথম ধাপে পর্যটক এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা দেওয়া হয়। প্রতিটি বগিতে কিউআর কোড রাখা হয়, যা স্ক্যান করেই যাত্রীরা সহজে ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক সময়ে চারটি ট্রেনে যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে যেসব রুটে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনুপস্থিত, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যাত্রীদের জন্য কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অ্যান্টেনা চুরি হলে বন্ধ হয়ে যায় পুরো সংযোগ

প্রযুক্তিবিদদের মতে, ট্রেনের ছাদে স্থাপিত ফ্ল্যাট অ্যান্টেনা বা স্যাটেলাইট টার্মিনালটি স্টারলিংক স্যাটেলাইট থেকে সংকেত গ্রহণ করে। এরপর ট্রেনের ভেতরের নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের মাধ্যমে সেই সংযোগ ওয়াই-ফাই হিসেবে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ফলে ছাদের মূল অ্যান্টেনা কিংবা বগির গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেটওয়ার্ক ডিভাইস চুরি বা নষ্ট হলে পুরো ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। চলন্ত ট্রেনে যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চুরি হলে দ্রুত প্রতিস্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করাই এখন প্রকল্পটির বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ইমাদুর রহমান বলেন, সরকারের ‘সবার জন্য ইন্টারনেট’ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই চলন্ত ট্রেনে স্যাটেলাইট সেবা চালু করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি চুরি হলেও দ্রুত সেগুলো প্রতিস্থাপনের চেষ্টা চলছে এবং সেবাটি আরও বিস্তৃত করতে বিএসসিএল কাজ করছে।

ভবিষ্যতে বাস-ফেরিতেও স্টারলিংক

ট্রেনে পরীক্ষামূলক সেবায় ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর স্টারলিংক সংযোগ রেলপথের বাইরেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে বিএসসিএল। ইতোমধ্যে রাজধানীর নারীদের জন্য নির্ধারিত ‘পিঙ্ক বাসে’ পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দূরপাল্লার বাস ও ফেরিতেও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া একজন যাত্রী যাতে একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ট্রেন, বাস ও ফেরিতে ইন্টারনেট সুবিধা নিতে পারেন, সে জন্য ‘একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থা’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে যেসব সড়ক ও নৌপথে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, সেখানে এই প্রযুক্তিকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তবে প্রযুক্তির পরিধি বাড়ানোর আগে সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। চুরি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে দেশের সব আন্তঃনগর ট্রেনে বাণিজ্যিকভাবে স্টারলিংক সেবা চালুর পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে স্টারলিংক যন্ত্রপাতি চুরির বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button