ধর্ম

‘প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে’, (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)

বাংলা টিভি ডেস্ক: বনের নীরবতা ভেঙে পাখির কিচিরমিচির, নদীর তীরে হরিণের ছুটে চলা কিংবা আকাশে পাখিদের সারি—প্রকৃতির এসব দৃশ্য শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং এগুলো আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনারও নিদর্শন। অথচ মানুষের নির্বিচার শিকার, বন উজাড়, প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশদূষণের কারণে পৃথিবীর অসংখ্য বন্যপ্রাণী আজ অস্তিত্বের হুমকিতে রয়েছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ৪ সেপ্টেম্বর পালিত হয় জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবস। বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয়টি আধুনিক পরিবেশ সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর মৌলিক নীতিগুলো ইসলামের শিক্ষায় বহু আগেই সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

কোরআন ও হাদিসে শুধু মানুষের প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীলতার কথা বলা হয়নি; আল্লাহর সব সৃষ্টির প্রতিই মমতা ও দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই এবং নিজ ডানা দিয়ে উড়ে এমন কোনো পাখিও নেই, যারা তোমাদের মতো একেকটি সম্প্রদায় নয়।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব জীবনব্যবস্থা, প্রয়োজন ও আবাসস্থল রয়েছে। তারা কেবল মানুষের ব্যবহার বা ভোগের উপকরণ নয়; বরং আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।

তাই অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা করা, তার আবাসস্থল ধ্বংস করা কিংবা নিছক বিনোদনের জন্য শিকার করা ইসলামের দয়া ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাণী হত্যার মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করাও উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আকাশকে তিনি সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন তুলাদণ্ড, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না কর ভারসাম্যের ক্ষেত্রে।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৭–৮)

প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। বন, নদী, পাহাড়, মাটি, পাখি, কীটপতঙ্গ, মাছসহ সব প্রাণী পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। একটি বন ধ্বংস হলে শুধু বৃক্ষই হারিয়ে যায় না, সেখানে বসবাসকারী অসংখ্য প্রাণীও তাদের আবাসস্থল হারায়। আবার কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার প্রভাব পড়ে খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ওপর।

প্রাণীর প্রতি দয়া আল্লাহর রহমত পাওয়ার মাধ্যম

প্রাণীর প্রতি দয়া করার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এক হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করেছিলেন। সাহাবিরা জানতে চেয়েছিলেন, প্রাণীদের প্রতিও দয়া করলে কি সওয়াব পাওয়া যায়? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)

এই হাদিসের শিক্ষা ব্যাপক। তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি দেওয়া, ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া কিংবা কোনো অসহায় প্রাণীকে বিপদ থেকে উদ্ধার করাও আল্লাহর কাছে মূল্যবান আমল হতে পারে।

প্রাণী শিকারে ইসলামের নীতিমালা

ইসলাম প্রয়োজনীয় ও বৈধ শিকারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি। মানুষের খাদ্য ও প্রয়োজন পূরণের জন্য বৈধ শিকারের অনুমতি রয়েছে। তবে প্রয়োজন ছাড়া প্রাণী হত্যা, বিনোদনের উদ্দেশ্যে শিকার কিংবা প্রাণীকে অযথা কষ্ট দিয়ে হত্যা করা ইসলামের দয়া ও সংযমের নীতির বিরোধী।

একজন মুসলমানের কাছে শিকারও হতে হবে দায়িত্বশীল ও পরিমিত। কারণ মানুষকে পৃথিবীর ওপর দায়িত্বশীল হিসেবে পাঠানো হয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন…।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬৫)

সুতরাং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি আল্লাহর সৃষ্টি ও তাঁর নির্ধারিত ভারসাম্যের প্রতিও দায়িত্ব পালনের অংশ।

জাতীয় বন্যপ্রাণী দিবস তাই কেবল পশুপাখির অস্তিত্বের কথা স্মরণ করার একটি দিন নয়, বরং পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীর প্রতি মানুষের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। যে পৃথিবী মানুষের আবাস, একই পৃথিবী অসংখ্য প্রাণীরও নিরাপদ আশ্রয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৩)

তাই বন, পাহাড়, নদী ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। মানুষের হাতে যেন কোনো প্রাণীর অকারণ ধ্বংস না হয়; বরং আমাদের আচরণই হোক আল্লাহর সৃষ্ট জীবজগতের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সংরক্ষণের মাধ্যম।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button