বাংলাদেশ

‎দাদার সম্পত্তি লিখে নিয়ে উধাও নাতি, বাংলা টিভির প্রতিবেদন দেখে পাশে দাঁড়াল প্রশাসন ‎

গাইবান্ধা প্রতিনিধি( ডিজিটাল): শেষ সম্বল বলতে ছিল মাত্র চার শতাংশ বসতভিটার জমি। অভিযোগ, সেই জমিটুকুও কৌশলে লিখে নিয়েছেন নাতি। জমি হারানোর পর থেকেই মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে যান ৯০ বছরের আজিজুল রহমান ও তার ৮০ বছরের স্ত্রী মাজেদা বেগম।

এরই মধ্যে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বৃদ্ধ আজিজুল রহমান। হাসপাতালের বিছানায় কাতর স্বামীকে পাশে বসে সেবা করছিলেন বৃদ্ধা মাজেদা বেগম। তাদের এমন অসহায়ত্বের দৃশ্য উঠে আসে বাংলা টিভির একটি প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটি প্রচারের পর বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় প্রশাসনের। পরে অসহায় এই দম্পতির পাশে দাঁড়ায় প্রশাসন।

মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মোড়লপাড়ায় আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগমের বাড়িতে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তিনি দম্পতির জন্য চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যান। একই সঙ্গে আজিজুল রহমানের চিকিৎসার জন্য ওষুধ কেনার উদ্দেশ্যে নগদ ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

প্রশাসনের এই সহায়তায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান হয়নি বৃদ্ধ দম্পতির।

বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মোড়লপাড়ার বাসিন্দা আজিজুল রহমান একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন। বয়সের ভারে এখন আর কাজ করার সক্ষমতা নেই। আধাভাঙা টিনের ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন তারা।

আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগমের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে ময়নুল রিকশা চালিয়ে নিজের সংসার চালান। তবে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এক মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা। অন্যের বাড়িতে কাজ করে নিজের সংসার চালানোর পাশাপাশি তিনি যতটা সম্ভব বাবা-মায়ের দেখভাল করেন।

বৃদ্ধ আজিজুলের শেষ সম্বল ছিল চার শতাংশ বসতভিটার জমি। অভিযোগ, নাতি নিশান কৌশলে সেই জমিও নিজের নামে লিখে নেন। এরপর থেকেই জীবনের শেষ সময়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান বৃদ্ধ দম্পতি।

এর মধ্যেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আজিজুল রহমান। স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য কিংবা পাশে থাকার মতো কাউকে না পেয়ে বিপাকে পড়েন মাজেদা বেগম। শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে স্বামীকে নিয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের গেটে পৌঁছান তিনি। সেখানে স্বামীর চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে থাকেন।

বৃদ্ধার এই অসহায়ত্ব নজরে আসে সোহেল রানা নামের এক যুবকের। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি নিজ উদ্যোগে আজিজুল রহমানকে হাসপাতালে ভর্তি করান। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থাও করেন।

পরে বাংলা টিভিতে প্রচারিত হয় বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর জীবনযাপনের প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি প্রশাসনের নজরে আসার পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইউএনও সবুজ কুমার বসাক তাদের বাড়িতে গিয়ে সহায়তা করেন।

তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পেলেও পুরোপুরি দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারেননি আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগম। কারণ, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের প্রয়োজন শুধু কয়েক দিনের খাবার কিংবা একবারের চিকিৎসা নয়। প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসা, নিরাপদ বসবাসের নিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আপনজনের একটু মমতা।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বৃদ্ধ দম্পতিকে নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেওয়া হলে তাদের জীবন আরও কিছুটা নিরাপদ ও স্বস্তির হবে।

বয়সের ভারে যখন মানুষ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তখন রাষ্ট্র ও সমাজের সহায়তাই হয়ে ওঠে তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। একটি সংবাদ প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের এই উদ্যোগ সেই মানবিক দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন।

এখন আজিজুল রহমান ও মাজেদা বেগমের একটাই প্রত্যাশা—জীবনের শেষ দিনগুলো যেন অনিশ্চয়তা, অভাব আর অবহেলায় না কাটে। চিকিৎসা, খাবার, নিরাপদ আশ্রয় এবং মানুষের ভালোবাসায় যেন বাকি জীবনটা একটু শান্তিতে কাটাতে পারেন তারা।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button