বাংলাদেশ

ঋণের বোঝা কাঁধে, জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে অসহায় পরিবার

‎রিফাতুন্নবী রিফাত, গাইবান্ধা থেকে: আধাভাঙা টিনের ছোট্ট ঘর। ঘরের এক কোণে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানিক মিয়ার বসবাস। আরেক কোণে থাকার কথা ছিল তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন অটোরিকশাটি। কিন্তু সেই জায়গাটি এখন খালি। অটোরিকশা হারানোর পর থেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন গাইবান্ধার সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের ঝিনেশ্বর গ্রামের এই অটোচালক।
‎
‎অটোরিকশাটি হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মানিক মিয়া। তাঁর এই কান্না কোনো স্বজন হারানোর বেদনা নয়; সংসার চালানোর একমাত্র পথ হারিয়ে ফেলার অসহায়ত্বের কান্না। স্ত্রী চায়না বেগম ও সন্তানকে নিয়ে কোনোমতে চলা সংসারটিতে এখন নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
‎
‎স্থানীয়রা জানান, একসময় ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন মানিক। কিন্তু শারীরিক নানা সমস্যার কারণে আগের মতো ভ্যান চালাতে পারছিলেন না। শেষ সম্বল ভ্যানটি বিক্রি করে এবং একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কয়েকদিন আগে তিনি প্রায় ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি অটোরিকশা কেনেন।

অটোরিকশাটি চালিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি সংসারের খরচ চালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা হবে এমন আশাতেই নতুন করে পথচলা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন টিকেছে মাত্র তিন দিন।
‎
‎মানিকের অভিযোগ, গত ২৬ আগস্ট সকালে অটোরিকশা নিয়ে বের হন তিনি। সকাল ৯টার দিকে গাইবান্ধা শহরের দাস বেকারির মোড়ে এক ব্যক্তি ধর্মপুর জুটমিলে যাওয়া-আসার কথা বলে ৪০০ টাকায় তাঁর অটোরিকশা ভাড়া নেন। পরে দিনভর শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর দুপুরের দিকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পুকুরের সামনে।
‎
‎সেখানে তৃষ্ণা মেটানোর কথা বলে মানিককে একটি জুস কিনতে বলা হয়। তাঁর অভিযোগ, ওই ব্যক্তি নিজে জুস পান করার পর তাঁকেও তা পান করতে দেন। কিছুক্ষণ পরই অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যান মানিক। এরপর তাঁর মোবাইল ফোন, নগদ ৪০০ টাকা ও প্রায় ৮০ হাজার টাকা মূল্যের অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
‎
‎অচেতন অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে ছিলেন মানিক। পরে স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মী তাঁকে দেখতে পেয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। রাত প্রায় ১১টার দিকে সেই পোস্ট পরিবারের নজরে এলে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
‎
‎সুস্থ হওয়ার পর ঘটনার বিচার এবং অটোরিকশা উদ্ধারের আশায় থানায় অভিযোগ করেন মানিক। গত ২৭ আগস্ট গাইবান্ধা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। পরে পুলিশ সুপারের নির্দেশে গত ৩ সেপ্টেম্বর আবারও অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর সদর থানা থেকে তাঁকে সুন্দরগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিতে বলা হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জ থানায়ও লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
‎
‎অটোরিকশা হারানোর পর কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন। কিন্তু এখনো সেটি ফিরে পাননি মানিক। কর্মহীন হয়ে পড়ায় একদিকে এনজিও ঋণের কিস্তি, অন্যদিকে স্ত্রী-সন্তানের সংসার চালানোর খরচ সব মিলিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।
‎
‎মানিক মিয়ার স্ত্রী চায়না বেগম বলেন, অটোরিকশাটিই ছিল তাঁদের পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ। সেটি হারিয়ে যাওয়ার পর সংসারে আয় বন্ধ হয়ে গেছে। কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
‎
‎এলাকাবাসীরাও মানিকের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, অটোরিকশাটি উদ্ধার করা গেলে মানিক আবার কাজে ফিরতে পারবেন। পাশাপাশি প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবান কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে একটি অটোরিকশার মাধ্যমে পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
‎
‎অটোরিকশাটি ফিরে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন মানিক। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসক বরাবরও আবেদন করেছেন তিনি। তবে হারানো অটোরিকশা ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ চান এই অসহায় অটোচালক।
‎
‎মানিকের আকুতি, কেউ যদি তাঁকে একটি অটোরিকশা কিনে দিয়ে সহযোগিতা করেন, তাহলে স্ত্রী চায়না ও সন্তানকে নিয়ে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন তিনি। নিজের শ্রম দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে সংসার চালাতে চান তিনি।
‎
‎এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, ‘অটোরিকশা চুরির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে অটোরিকশাটি উদ্ধারের জন্যও কাজ চলছে।’
‎
‎একটি অটোরিকশা কারও কাছে হয়তো শুধুই একটি যানবাহন। কিন্তু মানিক মিয়ার কাছে সেটিই ছিল তাঁর সংসারের স্বপ্ন, স্বস্তি ও বেঁচে থাকার অবল…

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button