বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের প্রয়াণ দিবস আজ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না চলে না, এমন বহু কালজয়ী সংগীতের রচিয়তা বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। তার ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। আজকের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
জানা যায়, এই কিংবদন্তি বাউলের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওর কালনী নদী তীরবর্তী উজানধল গ্রামে। তার বাবা ছিলেন দিনমজুর ইব্রাহিম আলী ও মা নাইওরজান বিবি। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
হাওর ভাটির বাসিন্দা শাহ আব্দুল করিমের পরিবারের অভাবের সংসারে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরাত’। বাবার সংসারের অভাব মেটাতে ছোটবেলা থেকে শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হয়েছে শাহ্ আব্দুল করিমকে। কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের সুযোগ হয়নি গুণি মানুষটির। গ্রামের মোড়ল বাড়িতে গরু রাখালের চাকরি করতেন তিনি। নিজে গান রচনা করতেন, সুরও দিতেন। শাহ্ আব্দুল করিমের মা নাইওরজান বিবি গ্রামের আরেক গান পাগল মানুষ করম উদ্দিনকে বাবা (ধর্মের বাপ) ডেকেছিলেন। সুযোগ পেলে করম উদিনের কাছে গিয়ে তালিম নেওয়ার চেষ্টা করতেন শাহ্ আব্দুল করিম।
সেই করম উদ্দিনের পুত্র ৭২ বছর বয়সি আকমল হোসেন শাহ আব্দুল করিমের নানা স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার দাদা করম উদ্দিনের কাছে গানের তালিম নিতে আসতেন শাহ্ আব্দুল করিম। দাদা তাকে ভালোবাসতেন। আমার বাবা আছদ্দর মিয়া ও শাহ্ আব্দুল করিম পরে একসঙ্গে বিভিন্ন মালজোড়া গানের আসর করেছেন। তখন গান গেয়ে তেমন টাকা পয়সা মিলতো না। তবুও বাউল করিম গানের আসরে যেতেন।
আকমল হোসেন আরও বলেন, নিজের খাওয়া, থাকা, সংসারের চিন্তা কখনও মাথায় নেননি শাহ্ আব্দুল করিম। গান পাগল ছিলেন ছোটবেলা থেকে। শাহ্ করিমের সংসারে এতটা দারিদ্রতা ছিল, তার পাঁচ বোনকে বিয়ে দিতে পরিবারের আর্থিকভাবে বেগ পেতে হয়েছে তখন।
তিনি বলেন, শাহ্ আব্দুল করিম ২৫-৩০ বছর বয়সে কোথাও মালজোড়া বা যাত্রা হলে যেতেন। একসময় কেবল হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোতে জনপ্রিয়তা ছিল বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের গান। তার নানা গান ইউটিউব ও ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে এখন পৃথিবীজুড়ে উপভোগ করছে মানষ।
এলাকাবাসী জানান, ১৫ বছর বয়সে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন করিম। সেটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তিনি ভর্তি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি জীবদ্দশায় দেড় হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। শাহ্ আব্দুল করিম বাউলের পাশাপাশি ছিলেন রাজনীতি সচেতন। তিনি সব সময় গণমানুষের সঙ্গে থেকেছেন। তার গানের কথায় যেমন ফুটে উঠেছে ভাটি বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা; তেমনি তিনি বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে থাকা সব অপশক্তির বিরুদ্ধেও কলম ধরেছেন।
তার একমাত্র ছেলে শাহ নূর জালাল বলেন, বাবার জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকীতে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত-শত বাউলভক্ত আমাদের বাড়িতে আসেন।
উল্লেখ্য, শাহ আব্দুল করিমের লেখা গান নিয়ে এই পর্যন্ত ছয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হচ্ছে ‘আপ্তাব সংগীত’, ‘গণসংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘জাতির চিঠি’, ‘কালনীর তীরে’ ও ‘দোলমালা’। বাংলা একাডেমি তার দশটি গান ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছে। তিনি জীবদ্দশায় একুশে পদক, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ দেশে-বিদেশে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তবে এসব সম্মান সুরস্কারের তোয়াক্কা কখনও করেননি সমাজ পরিবর্তনের স্বাপ্নিক বাউল শাহ্ আব্দুল করিম।



