শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে আজ: প্রধানমন্ত্রী

বাংলা টিভি ডেস্ক: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্প-বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগের পর্যায়ে ফিরে আসবে।
সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, এমসিসিআইসহ ২১টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। বৈঠকে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনাও দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি সরকারকে তার মেয়াদে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সময় এলে জনগণই নির্ধারণ করবে কার হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে। তবে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান তিনি।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি এবং চাইলেই কয়েক মাস বা এক বছরের মধ্যে এর পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জিটুজি ভিত্তিতে এর প্রস্তুতিমূলক কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। সরকারের আশা, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন টার্মিনালটি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সীমাও তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাস্তব পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। তবে সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্প ও ব্যবসা খাতের ক্ষতি হলে তার প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো দেশের অর্থনীতিতেই এর প্রভাব পড়ে। তাই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধান ব্যবসায়ীদের একার স্বার্থের বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
হতাশ না হওয়ার আহ্বান
বর্তমান সংকট নিয়ে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যাগুলোর বাস্তবতা ব্যবসায়ী মহল আগে থেকেই জানে। সরকার বিষয়গুলো গোপন না করে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছে এবং সমাধানের পথও জানিয়েছে। সরকার সংকট নিরসনে কাজ করছে—এ বিষয়টি সবাইকে জানানোই বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইলেন
সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই গণমাধ্যমকে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন, যাতে জনগণের কাছে বিষয়গুলো সঠিকভাবে তুলে ধরা যায়।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, সরকারকে সহযোগিতা করলে জনগণের জন্য আরও ভালো কিছু করা সম্ভব হবে।
পাঁচটি এলএনজি টার্মিনালের পরিকল্পনা
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর দেশের একটি নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন কারিগরি সমস্যার কারণে অচল ছিল।
তিনি বলেন, শুধু অচল টার্মিনালটি মেরামত করাই নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ২০২৮ সালের আগেই সম্ভব হলে তৃতীয় একটি এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে মোট পাঁচটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে বলে জানান তিনি। শুধু এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভর না করে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও তেল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য শক্তি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।
বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী সরকারের নীতিগত সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, মঙ্গলবার রাত থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকট শুরুর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আগামী দিনে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের বিষয়ে সরকারের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সময়ে গৃহস্থালি পর্যায়েও সাধারণ মানুষকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। তবে চলতি মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।



