আন্তর্জাতিক

অমুসলিমদের ভয় কাটাতে ব্রিটেনে শতাধিক মসজিদ উন্মুক্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ব্রিটেনে মুসলিমবিদ্বেষ ও মসজিদে হামলার ঘটনা বাড়তে থাকায় ইসলাম ও ব্রিটিশ মুসলিমদের সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ করে দিতে শতাধিক মসজিদ সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ‘ভিজিট মাই মসজিদ’ কর্মসূচির আওতায় লন্ডন, বার্মিংহাম, শেফিল্ড, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, সাউথেন্ড ও কার্ডিফসহ বিভিন্ন শহরের মসজিদে এ আয়োজন করা হয়।

মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভিজিট মাই মসজিদ’ কর্মসূচি এবার ১১ বছরে পড়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন মসজিদে দর্শনার্থীদের জন্য চা, নানা সংস্কৃতির খাবার, আলোচনা, আন্তধর্মীয় কার্যক্রম, শিল্প প্রদর্শনী ও মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের মতে, মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষের ঘটনা বাড়ার কারণে এবার এ উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

উত্তর লন্ডনের লন্ডন ইসলামিক কালচারাল সোসাইটিও কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। গত তিন বছরে এই মসজিদটি একাধিক হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছে। একটি ঘটনায় এক নারী মুসল্লিদের উদ্দেশে তাদের সন্তানদের হত্যার হুমকি দেন। আরেক ঘটনায় ভবনের গ্যাসের পাইপে পরিবর্তন করে গ্যাস জমে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হয়। এসব ঘটনার পরও মসজিদ কর্তৃপক্ষ আরও বেশি মানুষের জন্য তাদের দরজা উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের মহাসচিব ড. ওয়াজিদ আখতার বলেন, বর্তমান সময়ে ব্রিটিশ মুসলিম ও তাদের প্রতিবেশীদের সম্পর্কে অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং বিভিন্ন অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তথ্য পাচ্ছেন। তার মতে, এর ফলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ধারণা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের মরিয়ম সেন্টারের প্রধান সুফিয়া আলম বলেন, বন্ধুত্ব ও সংহতি যে ঘৃণার চেয়ে শক্তিশালী—এটি তুলে ধরতেই তাদের মসজিদ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ যখন মসজিদে এসে মুসলিম পরিবার, স্বেচ্ছাসেবক ও মুসল্লিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান, তখন ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা ও ভয় দূর হতে শুরু করে।

এদিকে মসজিদের নিরাপত্তা নিয়েও ব্রিটেনের মুসলিমদের উদ্বেগ বাড়ছে। ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গড়ে প্রতি পাঁচ দিনে একটি মসজিদ হামলার শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে ভয় দেখানো, সহিংসতা, সম্পত্তির ক্ষতি, হয়রানি, মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য, অনলাইন নির্যাতন ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা রয়েছে।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের চেডল মসজিদের ফারুক রফিক ‘ভিজিট মাই মসজিদ’ কর্মসূচিকে এমন একটি সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে মানুষ ভুল বোঝাবুঝির শিকার একটি ধর্ম ও এর অনুসারীদের সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পান। একইভাবে ফিন্সবুরি পার্ক মসজিদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কোজবার মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় উন্মুক্ততা, সংলাপ ও পারস্পরিক সংহতির ওপর গুরুত্ব দেন।

লন্ডন ইসলামিক কালচারাল সোসাইটির মসজিদটি পরিচালনা করেন বিবি খান। তিনি যুক্তরাজ্যের কোনো মসজিদের সভাপতি হওয়া প্রথম নারী। তার মতে, গণমাধ্যমে অনেক সময় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে উঠে আসে না। তাই নিজেদের বিশ্বাস, সামাজিক কার্যক্রম ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

মসজিদটির আয়োজনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষও অংশ নেন। সেখানে প্রায় দুই ডজন মানুষ একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন। ইসলাম পালন করেন না—এমন কয়েকজনও মসজিদ ও ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ থেকে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। পুরো আয়োজন চলাকালে মসজিদ প্রাঙ্গণে পুলিশের উপস্থিতিও ছিল।

অনুষ্ঠানে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। হ্যারিঙ্গে মুসলিম ও ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিবি খান বলেন, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহাবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ইহুদি প্রতিনিধি জুডিথ প্রিন্সলিও তার উপাসনালয়ের কাছে ইহুদিবিদ্বেষী গ্রাফিতি এবং উপাসনালয়ে আসা মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয়ের কথা তুলে ধরেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিবি খান। তার মতে, গুজব ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মানুষের মধ্যে ভয় ও সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো জরুরি।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button