মহানবীকে নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট, শ্রীলঙ্কান যুবকের মৃত্যুদণ্ড সৌদির

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে সৌদি আরবে ২৪ বছর বয়সী এক শ্রীলঙ্কান অভিবাসী শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আনোজান শিবারাসা নামের ওই যুবকের পরিবারের সঙ্গে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানিয়েছে বিবিসি। ছেলের জীবন রক্ষায় সৌদি সরকারের কাছে ক্ষমার আবেদন জানিয়েছে তার পরিবার।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনোজানের মা রাসামানিক্কাম যোগালক্ষ্মী কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলেকে ক্ষমা করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে শ্রীলঙ্কাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আনোজানের সাজা মওকুফের জন্য দেশটির রাজনৈতিক দল, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো তারিখ বা সময়সূচি জানায়নি। ফলে কবে তার সাজা কার্যকর হবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে সৌদি আরবে পরিবার কিংবা সংশ্লিষ্ট বিদেশি দূতাবাসকে আগাম না জানিয়েও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নজির রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত জুনের শেষ দিকে। শ্রীলঙ্কায় একটি ধর্মীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ঘিরে একটি ঘটনার পর এক মুসলিম তরুণের একটি কুকুরকে লাথি দেওয়ার ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে শুরু হয় ধর্মীয় বিতর্ক।
এরই মধ্যে এক ব্যক্তি হিন্দু ধর্মের একটি দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আনোজান তামিল ভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে নিজের মন্তব্য মুছে দিয়ে আনোজান ক্ষমা চেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তবে এরই মধ্যে তার মন্তব্যের স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিষয়টি তার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। জুলাই মাসে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর আনোজানের ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও মুছে দেয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আনোজানের ভাই হামসিদান শিবারাসা বিবিসিকে জানান, শুরুতে সৌদি আরবে কেউ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। শ্রীলঙ্কার কয়েকজন ব্যক্তি আনোজানের কর্মস্থলে ই-মেইল পাঠানোর পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। পরে প্রতিষ্ঠানটি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জানালে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
মামলার প্রথম পর্যায়ে আল-আহসা ক্রিমিনাল কোর্ট আনোজানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করে। পরে সাজা কমানোর আবেদন করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ।
এরপর গত ১৭ সেপ্টেম্বর মামলায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সৌদি প্রসিকিউশন সাইবার অপরাধ আইনের পরিবর্তে শরিয়াহ আইনের আওতায় আনোজানের বিচার চেয়ে আপিল করে। আপিল আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে এবং তার সাজা মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করে।
আনোজানকে আইনি সহায়তা দিতে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর তার পরিবারের সদস্যরা প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট তাদের আশ্বস্ত করেন, আনোজানের জন্য সাধারণ ক্ষমা আদায়ে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
সৌদি যাচ্ছে শ্রীলঙ্কার আইনি প্রতিনিধিদল
আনোজানের মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সৌদি আরবে তার আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করতে শ্রীলঙ্কার চার সদস্যের একটি আইনি প্রতিনিধিদল দেশটিতে যাচ্ছে।
প্রতিনিধিদলের সদস্য প্রেসিডেন্টস কাউন্সেল উপুল কুমারাপ্পেরুমা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের দুটি আইন প্রতিষ্ঠান আনোজানের মামলা পরিচালনা করছে। তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করে মামলার বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হবে।
এদিকে ২৮ সেপ্টেম্বর আনোজানের পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। তার ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার কাছ থেকে আর কোনো ফোন পাননি। বিষয়টি দূতাবাসকে জানিয়ে তার অবস্থার বিষয়ে তথ্য চাওয়া হলেও এখনো কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
সৌদি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাধারণত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি থাকে না। কারাগার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে সৌদি আরবে কঠোর সাজা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ২০২৩ সালে সৌদি নাগরিক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আল-গামদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই সাজা বাতিল করে তাকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে এক কোটিরও বেশি বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ভাষাগত সমস্যা ও পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাবে স্বল্প আয়ের অভিবাসী শ্রমিকরা দেশটির বিচারপ্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।



