
রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রিদের জিম্মি করে পকেট কেটে মুনফা লুটছে পরিবহন মালিকরা।পরিসংখান অনুযাই রাজধানীতে যাত্রীর তুলনায় পরিবহনের সংখ্যা কম। সেখানে কম যাত্রি পরিবহন করে বেশি মুনফা লোটার জন্য সিটং সার্ভিস চালু হয়েছে বলে মনে করেন নিত্য যাত্রিরা। বিশেষ করে অফিস টাইমে নির্ধারিত ভাড়ার থেকে বেশি ভাড়া দাবি করে পরিবহন শ্রমিকরা। রাজি না হলে বাসে উঠতে দেন না তারা। আর অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের দাবি অনুযাই বেশি ভাড়া দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। বিটিআরসি নির্ধারিত তালিকার থেকে বেশি টাকা আদায় করলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না তারা।
অথচ, এই ‘সিটিং সার্ভিস’ নিয়ে নৈরাজ্য বন্ধে সরকার গঠিত কমিটি এক বছরের বেশি সময় আগে ২৬টি সুপারিশ জমা দিয়েছিল। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল শর্ত সাপেক্ষে সিটিং সার্ভিস রাখা, বাসে যাত্রী তোলা নিয়ে রেষারেষি ও যত্রতত্র বাস থামানোর মতো পদক্ষেপ। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেই। উপরন্তু গত ১৩ মাসে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুই মাসের বেশি সময় নানা কর্মসূচি পালন করেছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি।
সড়ক বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসীর মতে, সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে মূল সমস্যার দিকের সরকারের তেমন মনোযোগ নেই, মামলা ও জরিমানার দিকেই বেশি আগ্রহ। এতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলার অন্যতম হলো গণপরিবহনে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া। বাড়তি ভাড়া নিয়েও আছে নৈরাজ্য। ঢাকা মহানগরে বিআরটিএ-নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া বাসের জন্য ৭ টাকা আর মিনিবাসের জন্য ৫ টাকা। মহানগর পরিবহন নীতিমালায় লোকাল বা সিটিং ভেদে ভাড়ার কোনো হেরফের নেই। মোটরযান আইনেও সিটিং সার্ভিস বলে কিছু নেই। অথচ, সিটিং সার্ভিসের বাসগুলোতে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ২৬ টাকা পর্যন্ত নিতে দেখা যায়। প্রতিটি বাসে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানোর নিয়ম আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিভিন্ন পথে চলাচলকারী অন্তত ২০টি পরিবহনের বাসে উঠে দেখা যায়, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানো নেই।
মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকে আজিমপুর পথে চলাচলকারী মিরপুর লিংক বাসটির সর্বনিম্ন ভাড়া ২৬ টাকা। মিরপুর রূপনগর থেকে আজিমপুর পর্যন্ত চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহনের সর্বনিম্ন ভাড়া ১৬ টাকা। ঢাকার অন্যান্য পথে চলাচলকারী লাব্বাইক, ওয়েলকাম, নিউ ভিশন, বসুমতীসহ আরও কয়েকটি পরিবহনের সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা। মিরপুর থেকে গুলিস্তান ও মতিঝিলে চলাচলকারী খাজাবাবা পরিবহন লিমিটেড, ইটিসি ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ও বিকল্প অটো সার্ভিস লিমিটেডের বাসগুলোর সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা। ভাড়া বেশি নেওয়া হলেও প্রতিটি বাসেই যত্রতত্র থামিয়ে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। চলন্ত বাসের দরজাও খোলা।
চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিল পথে চলাচলকারী নিউ ভিশন চালকের সহকারী নাজিমুদ্দীন বলেন, ‘ভাড়া সিটিংয়ের নিলেও দাঁড়ায় যাত্রী তুলি। সব বাসেই এমন দাঁড়ায় তোলে। রাস্তায় বাস কম। লোকজন বাধ্য হয়েই উঠে।’
রাজধানীতে ১৫ জানুয়ারি থেকে চলছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষ, চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম বলেন,যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। বাসচালকদের পাশাপাশি যাত্রীদেরও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধে ২০১৭ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পরিবহন মালিক সমিতি ও পুলিশ অভিযান শুরু করে। এ সময় পরিবহনমালিকেরা বাস বন্ধ করে দিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন। এরপর সিটিং সার্ভিস পুনরায় চালু করে এই বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে বিআরটিএ, মালিক-শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক প্রতিনিধি ও পুলিশের সমন্বয়ে আট সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২৬ দফা সুপারিশ–সংবলিত প্রতিবেদন ২০১৭ সালের নভেম্বরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।
এই সুপারিশগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আটকে আছে ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটিতে (মেট্রো আরটিসি)। ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমতি দেয় এই মেট্রো আরটিসি। জানতে চাইলে আরটিসির সদস্য বিআরটিএর উপপরিচালক মাসুদ আলম বলেন, আরটিসিতে সিটিং সার্ভিসের বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। আগামী সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
কমিটি সুপারিশ করেছিল, রাজধানীতে চলাচলকারী কিছু বাস সিটিং আর কিছু হবে লোকাল। দুই শ্রেণির বাসের রং হতে হবে আলাদা। সিটিং সার্ভিসে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না, স্টপেজ থাকবে কম। আর লোকাল বাসকে কোনো অবস্থাতেই সিটিং সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিল কমিটি। ভাড়া-নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি ও একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধে বেসরকারি মালিকদের অনুমতি বন্ধ রেখে বিআরটিসির দ্বিতল বাস বেশি করে চালুর পরামর্শ দিয়েছিল।
বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা কমানোসহ সড়কের নৈরাজ্য বন্ধে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। শুধু সচেতনতা বাড়াতে কর্মসূচি পালন করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই নৈরাজ্য বন্ধ হবে না।
বাংলাটিভি/পাইক



