আজকের ইসরাইলি সৈন্যদের পিতারা কি এভাবেই ‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামের বাসিন্দাদের হত্যা করেছিল?

অবৈধভাবে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন কোনো অপরাধযজ্ঞ নেই যা তারা করেনি। ইসরাইল পশ্চিমা নেতাদের সমর্থনে এবং পাশ্চাত্যের মিডিয়ার নীরবতার সুযোগে দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ‘দেইর আল-ইয়াসিন’ হত্যাকাণ্ড এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিগুলোর মধ্যে একটি।
১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল দখলীকৃত বায়তুল মোকাদ্দাসের পশ্চিম অংশের দেইর আল-ইয়াসিন এলাকায় ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল দখলদার ইহুদিবাদী সেনারা। ওই পাশবিক হত্যাযজ্ঞে ৩৬০ নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ‘মেনাচেম বেগিন’-এর নেতৃত্বে ‘আরগুন’ এবং বেগিনের উত্তরসূরি ‘ইসহাক শামির’ এর নেতৃত্বে ‘স্টিরেন লেহি’ নামে ইহুদিবাদীদের দুটি কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা ওই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।
‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামটি ১৫১৭ সালে ওসমানিয় শাসনের সময়কালের এবং ১৯৪৫ সালে এই গ্রামের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬১০। ১৯৪২ সালে গ্রামবাসীরা অভিবাসী ইহুদিদের সাথে একটি অনাগ্রাসন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এছাড়াও, জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী এই গ্রামটিকে ইসরাইলি শাসনের বাইরে রাখা হয়েছিল।
‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামে ইসরাইলের ওই হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া ফিলিস্তিনিরা জানিয়েছিল, ভোর তিনটার দিকে ইসরাইলের আক্রমণ শুরু হয়। এরপর গ্রামের বাসিন্দারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা হাগানাহ কমান্ডের কাছে সাহায্য চায়। এরপর তারা আবারও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রামে হামলা চালায় এবং নারী-পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে। ইহুদিবাদীরা বোমা ও ডিনামাইট দিয়ে একের পর এক গ্রামবাসীর বাড়িঘর উড়িয়ে দেয় এবং এভাবে ওই এলাকা দখল করে নেয়। হামলাকারীরা ‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামের কয়েক ডজন বাসিন্দাকে দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে গুলি করে হত্যা করে। এই মাত্রার অপরাধ করেও তারা থেমে থাকেনি এবং গ্রামের কয়েকজনকে চলন্ত গাড়ির পেছনে বেঁধে বায়তুল মোকাদ্দাসের রাস্তায় ও এর আশেপাশে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায় এবং বর্ণবাদী স্লোগান দেয়।
কুখ্যাত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হাগানার কমান্ডার মীর পায়েলের দেয়া তথ্য অনুসারে, ‘ইহুদিবাদী লাহি ও ইরগুনের লোকেরা গ্রামবাসীদের টাকা, সোনা, চিনি, রেডিও ইত্যাদি যা পেয়েছে তাই লুট করেছে। তারা ফিলিস্তিনি নারী ও মেয়েদের ধর্ষণ, গর্ভবতী মহিলাদের পেট চিরে ফেলা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা, চোখ উপড়ে ফেলা এবং মৃতদেহ বিকৃত করার মতো বেশ কিছু ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব কিছুর পেছনে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিজ জায়গা জমি ছেড়ে তাদেরকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করা’।
চার মেয়াদে ইসরাইলি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ইয়ারি তাজাবান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামে গণহত্যার পর তাকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর একদল তরুণ ব্রিগেডসহ ওই গ্রামে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি কোনো সশস্ত্র লোকের লাশ দেখতে পাননি। এভাবে ওই গ্রামের মানুষ এবং ইসরাইলি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে বলে যে কথা প্রচার করা হয়েছিল তা আসলে মিথ্যা প্রমাণিত হয় যদিও গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে বলে ইসরাইল বহু বছর ধরে প্রচার চালিয়ে আসছে। অবশেষে, ইহুদিবাদীরা তাদের অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য গ্রামের নিহত ও বিকৃত লাশগুলোকে গ্রামের পানির কূপে ফেলে দেয় এবং কূপের মুখ বন্ধ করে দেয়।
‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামে ইসরাইলিদের বর্বরতার খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার পর, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ওই গ্রামের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠায়। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে হাঁটার সময় রেড ক্রসের প্রতিনিধি আরবদের মৃতদেহ এবং বিচ্ছিন্ন অঙ্গগুলো দেখতে পান এবং কূপের মধ্যে ফেলে দেয়া মৃতদেহগুলোকে দেখতে পান। তার নির্দেশে পরবর্তিতে সমস্ত মৃতদেহ যা অত্যন্ত জঘন্যভাবে বিকৃত করা হয়েছিল সেগুলোকে কূপ থেকে বের করে আনা হয়।
ইসরাইল ‘দেইর আল-ইয়াসিন’ গ্রামে গণহত্যা চালিয়ে এমনভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল যা কিনা ফিলিস্তিনিদের অন্য অঞ্চলে বা প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে অভিবাসনে উৎসাহিত করেছিল।
এরফলে ফিলিস্তিনের আট লাখ জনসংখ্যার এই এলাকাটিতে মাত্র দেড় লাখ মানুষ রয়ে যায় এবং বাকিরা অন্যত্র চলে যায়। ওই গণহত্যার ঘটনা এতটাই হৃদয়বিদারক ছিল যে ইসরাইলের কিছু প্রধান ধর্মীয় গুরু বা রাব্বি এবং আলবার্ট আইনস্টাইন ও হান্না অরনেতের মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরাসহ আরো বিশিষ্ট ইহুদিরা এর নিন্দা করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনি ভূমির নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের হাতে। কিন্তু তারা ওই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি এবং হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য শুধুমাত্র একজন ইহুদি ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিল।
‘দেইর আল–ইয়াসিন‘ গ্রামে গণহত্যার পর (স্টার্ন) ও ‘আইজ্যাক শামির‘-এর কাছে আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রতিবাদী চিঠি
দেইর আল-ইয়াসিন গ্রামে ইসরাইলের বর্বর হত্যাকাণ্ডের একই সময়ে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোনাচেম বেগিন এবং তার সহযোগীরা তাদের স্ত্রী এবং বন্ধুদের সাথে করে ইয়াসিন গ্রাম থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি ইহুদি উপশহরে উৎসবের আয়োজন করেছিল। ওই অপরাধযজ্ঞের পর মোনাচেম বেগিন হোরিয়াত পার্টি (বর্তমানে লিকুদ) পার্টির প্রধান হন এবং পরপর তিন বার তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
মিসেস ‘সাহরে ‘দারবাস’-এর তৈরি ‘ম্যাসাকার অফ দেইর ইয়াসিন ভিলেজ’ নামক ডকুমেন্টারি ফিল্মে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে যেখানে তারা ইসরাইলি ভয়াবহ গণহত্যার বিবরণ দিয়েছেন। ওই ডকুমেন্টারিতে, পাঁচজন ফিলিস্তিনি সাক্ষী এবং দুজন ইসরাইলি সাক্ষী দেইর ইয়াসিন গণহত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। ৭৫ মিনিটের এই ডকুমেন্টারিতে, বিভিন্ন ছবি, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের রিপোর্ট ও প্রতিবেদন, গ্রামটির বাসিন্দাদের দেশান্তরিত হওয়ার আগে এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে পড়ার আগে তাদের অবস্থান সম্পর্কে একটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয় । পার্সটুডে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। বাংলা টিভি



